অপরিচিত কাউকে মেসেজ দেয়ার সময় যা মাথায় রাখা দরকার

বিভিন্ন সংস্থা, গ্রুপ, পেইজ, ইত্যাদির সাথে জড়িত থাকার সুবাদে অপরিচিত লোকদের কাছ থেকে প্রতিদিন অনেক মেসেজ পাই। আমি সবসময় সবার মেসেজের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে এসেছি, এক লাইনে হলেও। চেষ্টা করবো, ভবিষ্যতেও সেই চেষ্টাটা বজায় রাখতে। কিন্তু অনেক প্রেরকই মেসেজ পাঠানোর সময় ন্যূনতম কার্টেসিটুকু বজায় রাখেন না। তাই, মোটামুটি বাধ্য হয়ে মেসেজ দেয়ার সহজ কিছু নিয়ম নিয়ে এই লেখাটা লিখছি। লেখাটা অপরিচিতদেরকে মেসেজ দেয়ার জন্য লেখা হলেও পরিচিতদের ক্ষেত্রেও এই নিয়মগুলো প্রযোজ্য।  আসুন, নিয়মগুলো দেখে নেই…
 .

১) দয়া করে বাংলা বা ইংরেজিতে লিখুন। বাংলিশ একেবারেই কাম্য নয়।

বাংলিশে লেখার অসুবিধা অনেক। এক, আপনি বাংলা বা ইংরেজি কোনো ভাষার বানানই চর্চা করছেন না। দুই, আপনার লেখা পড়তে গ্রাহকের অসুবিধা হতে পারে। তিন, আমার পরিচিত অনেকে বাংলিশে লেখা মেসেজের রিপ্লাইই দেন না। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আজকাল বাংলায় লেখা এত সোজা, তারপরেও কেন আপনাকে বাংলিশের আশ্রয় নিতে হবে? আমার ষাটোর্ধ্ব বাবা আর পঞ্চাশোর্ধ মা যদি অনর্গল বাংলায় লিখে যেতে পারেন, তাহলে আপনার অজুহাত কী?
আমার আম্মু বাংলায় লিখছেন

.

২) অভিবাদন জানানোর সময় ধর্মনিরপেক্ষ উপায়ে অভিবাদন করুন।

আপনি ব্যক্তিগত জীবনে কোন ধর্ম বা আদর্শ মেনে চলেন, সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু যাকে মেসেজ পাঠাচ্ছেন, তার নাম দেখে ধর্ম আন্দাজ করে নিয়ে সেই উপায়ে অভিবাদন জানানোটা খুবই অস্বস্তিকর। যেমন ধরুন, আপনি খ্রিস্টান এবং বিদেশি কারো নাম দেখে আন্দাজ করলেন যে সেও খ্রিস্টান। যদিও আসলে সে ইহুদী! এরপর তাকে “Hail Jesus Christ, the lord, the savior” বলে মেসেজ দিলেন। গ্রাহকের জন্য সেটা অস্বস্তিকর হতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা কেমন হতে পারে, সেটা আপনার কল্পনাশক্তির ওপর ছেড়ে দিলাম। নামের সাথে যে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই, সেটা ভিন্ন আলোচনা বলে সেদিকে আর গেলাম না। এছাড়া যে কোনো ধর্মের অনুসারী নয়, তাকে আপনি আপনার ধর্মের গুণগান শুনতে (পড়তে) বাধ্য করছেন। খুব একটা সুখকর অনুভূতি নয়। এর চেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ অভিবাদন ব্যবহার করা সকলের জন্য স্বস্তিদায়ক।
 .

৩) অভিবাদনের পর সরাসরি আপনার মূল বক্তব্য তুলে ধরুন।

অনেকেই আছেন যারা “হ্যালো, আপনার সাথে একটু কথা ছিলো” বলে উত্তরের অপেক্ষা করেন। গ্রাহক উত্তর দিলে তারপর আসল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এতে কিন্তু আপনার উত্তর পেতে দেরি হচ্ছে। যদি শুরুতেই আসল প্রশ্ন বা সমস্যাটা বলে ফেলতেন, তাহলে প্রথম জবাবেই আপনার প্রশ্নের উত্তর বা সমস্যার সমাধান পেয়ে যেতেন।
আজ পর্যন্ত জানি না উনি কেন আমাকে মেসেজ দিয়েছিলেন।
 .

৪) যা লেখার, একবারে অনুচ্ছেদ আকারে লিখুন।

অনেকেই আছেন, যারা মেসেজ দেয়ার সময় এক লাইন করে লিখে পাঠাতে থাকেন। এতে করে যাকে মেসেজ পাঠাচ্ছেন, তার অনেক রকম সমস্যা তৈরি হতে পারে। প্রথম সমস্যা- ধরুন, গ্রাহকের মোবাইলের রিং টোন অন থাকে। তার মোবাইল অনবরত বেজেই যেতে থাকে, কারণ আপনি সব কথা একবারে না লিখে বারবার মেসেজের টুকরো পাঠাচ্ছেন। দ্বিতীয় সমস্যা – গ্রাহকের প্রচুর সময় নষ্ট হয়। কীভাবে? ধরুন, আপনার মেসেজের প্রথম টুকরো পেয়ে তিনি মোবাইল হাতে নিলেন। এরপর বাকি কথাগুলোর জন্য গ্রাহককে অপেক্ষা করতে হবে। বাকি কথাগুলো আসার আগেই তিনি রিপ্লাই টাইপ করা শুরু করলেও সময় নষ্ট হতে পারে। কারণ, পরের টুকরোগুলো আসলে হয়তো প্রথম টুকরোটার রিপ্লাই দেয়ার আর দরকারই নেই। বিশেষ করে, অপরিচিত কারো কাছ থেকে এরকম টুকরো টুকরো মেসেজ আসতে থাকলে ব্যাপারটা অত্যন্ত বিরক্তিকর।
 .
ওপরের ছবিটা খেয়াল করুন। উনি এক লাইন এক লাইন করে লিখে যাচ্ছেন। তৃতীয় মেসেজের পরে আমি রিপ্লাই করলাম “And?”. তখনো আমি ওনার মেসেজের কারণ জানি না। যতক্ষণে উনি আরো চারটা টেক্সট পাঠালেন, ততক্ষণে আমার ধৈর্য এবং সময় দুটোই শেষ!
.

৫) মূল বক্তব্য যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত রাখুন।

আপনি যাকে মেসেজ পাঠাচ্ছেন, তার ব্যস্ততা আর আপনার ব্যস্ততার মাত্রা ভিন্ন হতেই পারে। আপনার মেসেজের গ্রাহক মনের দিক থেকে যতই ভালো হোন না কেন, তার ব্যস্ততার মাত্রা হয়তো এত বেশি যে চাইলেও আপনার বিশাল বিশাল মেসেজ ওনার পক্ষে পড়া সম্ভব না। যদি আপনি কোনো ব্যাপারে সাহায্য চেয়ে মেসেজ দেন, বক্তব্য সংক্ষিপ্ত রাখলে আপনারই লাভ।
এটার প্রচুর উদাহরণ দিতে পারবো। কিন্তু সেটা না করে কাছাকাছি আরেকটা বোনাস নিয়ম যোগ করি। মূল বক্তব্য এত দীর্ঘ করবেন না যাতে আপনাকে ভয়েস মেসেজ পাঠাতে হয়। নিচের ছবিটা দেখুন – এই ভদ্রলোকের মূল বক্তব্য এত দীর্ঘ যে উনি আমাকে প্রায় সাড়ে চার মিনিটের ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছেন।
উনি বাংলিশেও লিখেছেন, একাধিক টেক্সটে লিখেছেন, মূল বক্তব্য অতি দীর্ঘায়িত করে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছেন। পাঁচটা ভয়েস মেসেজ দেখে আমার মাথায় প্রথম যে জিনিসটা এসেছিলো, সেটা হচ্ছে উনি আমাকে হোমওয়ার্ক দিয়েছেন। ওনাকে আর কোনোদিন রিপ্লাই দেয়া হয়নি।
.

৬) সাহায্য পেলে ধন্যবাদ দিন।

অত্যন্ত দুঃখের সাথে এই নিয়মটা লিখতে হচ্ছে। অনেকে সাহায্য চেয়ে নক করেন, কিন্তু সাহায্য পাওয়ার মত ন্যূনতম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন না। প্রায় দশ বছর ধরে উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে অনেকের কাছ থেকেই মেসেজ পেয়ে আসছি। অনেকে তাদের Statement of Purpose সম্পাদনা করে দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। সম্পাদনা একটা সময়সাপেক্ষ কাজ এবং কাজটাতে দরদও লাগে। কিন্তু সম্পাদিত ফাইলটা পাঠানোর পরে অনেকে আর রিপ্লাইই দেন না। কারণ, তার কাজ হয়ে গেছে।

এটা একটা সাম্প্রতিক উদাহরণ। এই লেখাটা যখন লিখছি, তখন ওনার স্টেটমেন্ট অফ পারপাস সম্পাদনা করে পাঠানোর এক সপ্তাহ হয়ে গেলো। উনি এখন পর্যন্ত আমাকে সামান্য ধন্যবাদটুকু দিলেন না। ধন্যবাদের জন্য কাজ করি না। কিন্তু যতটা সময় নিয়ে আমি ওনার লেখা পড়েছি, সম্পাদনা করেছি, নির্দেশনা দিয়েছি, তার ভগ্নাংশ সময় ব্যয় করে উনি আমাকে একটি শব্দ লিখতে পারতেন। শুধু একটি শব্দ!
 .

৭) দয়া করে খেয়াল রাখুন, আপনার কথাটা শুনতে/পড়তে রুঢ় মনে হচ্ছে কিনা।

মুখে কিছু একটা বলা আর লেখার মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে, থাকবেই। যদি আপনি কারো কাছে সাহায্য চেয়ে মেসেজ দেন, অন্তত সেক্ষেত্রে এটুকু খেয়াল রাখবেন যে আপনার লেখা মেসেজটা রুঢ় শোনাচ্ছে কিনা। যেটা হয়তো মুখে বললে বিনম্র শোনাতো, সেটা হয়তো লিখিত আকারে মার্জিত নাও শোনাতে পারে। আর অপরিচিত অভদ্রদেরকে সাহায্য করার ইচ্ছে পাঠকের নাই হতে পারে।
ওপরের ছবিটা আবার খেয়াল করুন। মনে হচ্ছে, আমি ওনার চাকরি করি। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন “Have you checked my SOP?” অথবা “Did you finish reviewing my SOP?”. যেন উনি আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছেন, এবং সেটা পালন করা আমার কর্তব্য। এ ধরনের ক্ষেত্রে এভাবে লিখুন, “Did you get the chance to review my SOP? I know you are busy but deadline to apply is coming soon and your suggestions are greatly appreciated”.
আশা করি, সহজ এই নিয়মগুলো মেনে চললে আপনার এবং আপনার মেসেজের পাঠক, দুই দলেরই লাভ হবে। আর কী সহজ এই নিয়মগুলো! না মানার কোনো অজুহাতই হয় না! জাতির বৃহত্তর স্বার্থে লেখাটা সবার সাথে শেয়ার করুন। আপনার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়, মেসেজিং এর এমন জিনিসগুলো চাইলে কমেন্টে লিখতে পারেন।
Share:

10 comments

  1. Thank you. I am a great fan of yours and have got a chance to introduce with you by your (Vocabuilder) book. I am so grateful to you because you have changed the tedious process of learning words into an easy and effective way.

  2. I really didn’t expect this to be such a beautiful piece of write-up. I second each of them. Special thumbs up for the point no.-2.

  3. আপনার ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর ক্ষমতা অসাধারণ। এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক।

    ভালো থাকবেন সবসময়।

    1. হা হা হা, আপনিও ভালো থাকবেন।

      নিয়মগুলো ছড়িয়ে দিন, প্লিজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *