পলাশীর যুদ্ধ

এ এমন এক কাহিনী যেটা কোনো অংশেই Game of Thrones এর চেয়ে কম নয়। আর এটা নিয়ে চাইলেই কয়েক সিজনবিশিষ্ট টিভি সিরিজ বানিয়ে ফেলা যায়। বাংলা একটা সিনেমা আছে অবশ্য, বেশ বিখ্যাত। দেখে নিতে পারেন, না দেখা থাকলে। তবে এটা আবারো নির্মাণের দাবি রাখে, এবং বিশাল বাজেট নিয়ে। কেন বিশাল বাজেট? আসুন, দেখে নিই…

পটভূমি

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন ভারতবর্ষে ফরাসীদের সাথে বাজার দখলে ব্যস্ত। বহুদূরে অস্ট্রিয়াতেও ১৭৪০ এর দিকে ফরাসি আর ইংরেজদের মধ্যে ঝামেলা চলছিলো। এমন সময় রবার্ট ক্লাইভ ভারতবর্ষের মাদ্রাজে এলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাল ধরতে, তার বিশেষত্ব – “যুদ্ধ”। দক্ষিণ ভারতে তখন ব্রিটিশ-ফরাসি অবস্থা খারাপের দিকে পৌঁছেছে।

আলীবর্দি খান তখন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব। তিনি চাননি, এমন অবস্থা তার রাজ্যের দিকেও আসুক। তিনি ইংরেজদেরকে কলকাতায় দূর্গ তৈরির অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের কাছ থেকে মোটা করও আদায় করেছিলেন, যাতে তাদেরকে দমিয়ে রাখা যায়। তার প্রতিপত্তি বেশ ভালো ছিলো। এবং সকলে তাকে পছন্দ করতো, তার বন্ধু-বান্ধবও কম ছিলো না। কারণ তিনি সবার সাথেই ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতেন, অনেকটা গেইম অফ থ্রোনসের রবার্ট বারাথিওনের মত।

১৭৫৬ সালে আলীবর্দি খান মৃত্যুবরণ করেন, এবং তার নাতী সিরাজ-উদ-দৌলা সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন অনেকটা গেইম অফ থ্রোনসের জফ্রি বারাথিওনের মত (কাহিনীতে রবার্ট বারাথিওনের ছেলে)। রাজ্য চালানোর কাজ তেমন বুঝতেন না, কিন্তু প্রচণ্ড রাগী ছিলেন, আবার খারাপ পরিস্থিতিতে সহজে ভয়ও পেয়ে যেতেন। তিনি যখন দেখলেন যে ইংরেজরা অনুমতি ছাড়া কিছু ভবন বানিয়েছে, এবং অন্য কিছু নিয়ম ভেঙেছে, তখন তিনি তার বাহিনী নিয়ে সেগুলো ধূলিস্যাতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সংখ্যায় ভারী ছিলেন বলে কোনো ঝামেলা ছাড়া তিনি কাশিমবাজারের দুর্গ দখল করেন, কলকাতাও দখল করে নেন।

সেখানে তিনি ১৪৬ জনকে এমন একটা কারাগারে বন্দী করেন যেটা আসলে ৬ জনের জন্য ব্রিটিশরা বানিয়েছিলো। ৫ দিন পর যখন সেই কারাগারের দরজা খুলে দেয়া হয়েছিলো, তখন মাত্র ২৩ জন বেঁচে ছিলো। বাকিরা কেউ অক্সিজেনের অভাবে, কেউ মাথা খারাপ হয়ে মারা যায়। তবে এই সংখ্যাটা নিয়ে সংশয়ের ব্যাপক সুযোগ আছে। এতটুকু জায়গার মধ্যে এতজনকে ঢোকানো সম্ভব কিনা, এবং আসলেই এতজনের মৃত্যু ঘটেছিলো কিনা, সেটা বিবেচনা করে সংখ্যাটা অতিরঞ্জিত এবং আপাতদৃষ্টিতে সত্য নয় বলেই অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন।

কলকাতার খবর যখন মাদ্রাজে পৌঁছুলো, তখন লর্ড ক্লাইভ রওনা দিলেন বাংলার উদ্দেশ্যে। কলকাতা থেকে ৩০ মাইল দূরে, ১৭৫৭ সালের জানুয়ারিতে, ক্লাইভের সুচতুর বুদ্ধিমত্তাসমৃদ্ধ আয়োজনে এবং একটা অতর্কিত আক্রমণে নবাবের প্রায় সাড়ে ৬০০ সৈন্য মারা যায়, এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অন্যদিকে ইংরেজদের মাত্র ৫৭ জনের মৃত্যু হয়। এটা দেখে নবাব ভয় পেলেন এবং আলীনগর চুক্তি করলেন। তাদেরকে দূর্গ তৈরির কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। ক্লাইভ তখন ফরাসিদের চন্দরনগর ধ্বংস করলেন। ফরাসিদের প্রতিপত্তি কমে গেলো অনেকটুকু। তাকে মাদ্রাজে ফিরে যাওয়ার আদেশ দিয়েছিলো কোম্পানি, কিন্তু তিনি সেটা উপেক্ষা করে বাংলাতেই রয়ে গেলেন, এবং হুগলির দিকে মনযোগ দিলেন। পটভূমি রচিত হলো।

ষড়যন্ত্র

চন্দরনগরের কথা জানামাত্রই ইংরেজদের প্রতি নবাবের পুরনো বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। তিনি সৈন্য জড়ো করতে চাইলেন। কিন্তু ঐ যে, তিনি খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না, সেটা এখন তার কাল হয়ে দাঁড়ালো। তার সভাসদদের মধ্যেই একটা ষড়যন্ত্র হলো যে নবাবকে উৎখাত করতে হবে। নবাবের সভাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যে প্রতিনিধি ছিলো, সে এটা টের পেয়ে গেলো, এবং ক্লাইভকে জানালো। তখন ক্লাইভ মীর জাফরের সাথে চুক্তি করলেন। মীর জাফর নিজেই নবাব হতে চাইলো। আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চাইলো, ব্যবসার ক্ষেত্রে আরো সুবিধা।

১৪ই জুন, ক্লাইভ নবাবকে যুদ্ধের ঘোষণা বার্তা পাঠালেন।

১৫ই জুন, নবাব বুঝে ফেললেন মীর জাফর এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত। তিনি মীর জাফরের প্রাসাদে আক্রমণ করলেন। কিন্তু ভয় পেয়েই হয়তো, তার সাথে সন্ধি করলেন। মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ কোরানে হাত রাখিয়ে মীর জাফরের কাছ থেকে শপথ আদায় করলেন যাতে সে বিশ্বাসঘাতকতা না করে। অবশ্য মীরজাফর ক্লাইভের কাছেও চিঠি পাঠালো যে সে কোম্পানির সাথে তার চুক্তি ভঙ্গ করবে না।

২১শে জুন, ক্লাইভ বুঝতে পারছিলো না, মীরজাফর আসলে কোন দিকে বাঁক নেবে। সে কি ষড়যন্ত্রে থাকবে, নাকি থাকবে না। সে একটা মিটিং করলো, এবং সকলের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।

২২শে জুন, ক্লাইভ তার সৈন্যদেরকে ভাগীরথী নদ অতিক্রম করতে নির্দেশ দিলো।

যুদ্ধ শুরু হতে আর বেশি বাকি নেই।

যুদ্ধের দিন, ২৩শে জুন

২২শে জুন দিবাগত রাতে, অর্থাৎ ২৩শে জুন রাত ১২ ঘটিকার পরে, ক্লাইভের সৈন্যরা পলাশীতে এসে পৌঁছুলো। নবাবের বাহিনী সেখানে একদিন আগেই এসে উপস্থিত হয়েছে। পরিখা খননের পরে সবাই কিছুটা হলেও বিশ্রাম নিয়ে নিতে পেরেছে, পূর্ণ উদ্যমে শত্রুর সাথে যুদ্ধের জন্য সক্ষম। সিরাজ-উদ-দৌলার বাহিনীতে মোট সৈন্য সংখ্যা ৬০ হাজার। সামনের দিকেই নবাবের বিশ্বস্ত মীরমদন আর মোহনলালের প্রায় ১২ হাজার সৈন্য। আর তার পেছনেই ৪৫ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো মীরজাফর, ইয়ার লতিফ, আর রায়দুর্লভ। ক্লাইভ এখনো বুঝতে পারছে না, এই বাহিনী যদি সিরাজ-উদ-দৌলার হয়ে লড়ে, তাহলে তার ৩০০০ সৈন্যওয়ালা বাহিনীর কী হবে?

বুঝতেই পারছেন, সবাই মিলে যুদ্ধ করলে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া বাহিনীকে পরাজিত করা কোনো ব্যাপারই ছিলো না। যাই হোক, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ৩০০০ সৈন্য নিয়েই লর্ড ক্লাইভ চলে এলেন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে আক্রমণ করতে। শুরুতেই ছিলো মীরমদনের সম্মুখ বাহিনী। তার আক্রমণের কাছে টিকতে না পেরে ক্লাইভের বাহিনী পিছু হটলো, আর সেখান থেকেই কামান দাগাতে থাকলো।

এরপর মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। ইংরেজরা নিজেদের গোলাবারুদ ঢেকে নিলেও নবাবের বাহিনী নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিলো। বৃষ্টি শেষে মীর মদন মনে করলেন, ইংরেজদেরও গোলাবারুদ ভিজে গেছে বুঝি! তাই, এগোতে লাগলেন। কিন্তু উল্টো গোলা খেয়ে মারাত্মক আহত হয়ে ফিরে এলেন। সিরাজ-উদ-দৌলা এ খবর পেয়ে মুষড়ে পড়লেন। মীর জাফরকে বললেন, “তুমি আমার পাগড়ি রক্ষা করো।” মীর জাফর তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, “যুদ্ধে জয় আমাদেরই হবে।” কিন্তু সাথে সাথে ক্লাইভকেও জানালেন, “সামনে বাড়ো, আক্রমণ করো। আমরা তোমাদের সাথে আছি।”

রায় দুর্লভ তখন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে অনুরোধ করলেন, তাঁবু ছেড়ে রাজধানী মুর্শিদাবাদের দিকে চলে যেতে। ২০০০ সৈন্য সাথে নিয়ে নবাব তাই করলেন। ক্লাইভ সামনে বাড়তে থাকলেন, মীরজাফরের সৈন্য যুদ্ধে অংশ নিলো না। ততক্ষণে ক্লাইভ আর্টিলারির সহায়তা নিয়ে দুর্বার গতিতে এগোতে থাকলেন, পরিখা পর্যন্ত চলে এসে সব দখল করে নিলেন। যুদ্ধে সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় হলো।

ফলাফল ও পরবর্তী ঘটনার চুম্বকাংশ

সিরাজ-উদ-দৌলা পালিয়ে মুর্শিদাবাদ পৌঁছেছিলেন। পরে উপায়ান্তর না দেখে ছদ্মবেশে নৌকায় করে স্ত্রীসহ পাটনার দিকে রওনা দেন। পথে একজন তাকে মীরজাফরের ভাইয়ের হাতে ধরিয়ে দেয়। এই লোকটাকে একবার সিরাজ-উদ-দৌলা গ্রেফতার করিয়েছিলেন, শাস্তি দিয়েছিলেন। মীর জাফরের পুত্র সিরাজকে হত্যার নির্দেশ দেয়।

মীরজাফর সিংহাসনে আরোহণ করলো বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হিসেবে। ইংরেজদেরকে ব্যাপক পরিমাণের জমি দেয়া হলো, পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২২ লক্ষ রুপি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলো। এতো টাকা সিরাজের কোষাগারে ছিলোও না। তাই ১১ লক্ষের মত তখনই দেয়া হলো। বাকিটুকু অন্যভাবে পুষিয়ে দেয়া হবে, বলা হলো।

মীর জাফর খুব দ্রুতই বুঝতে পারলেন যে তিনি আসলে ইংরেজদের হাতের পুতুল। তিনি ডাচদেরকে বললেন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্যের জন্য। লর্ড ক্লাইভ আবারো অনেক কম সৈন্য নিয়ে ডাচদের বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করলেন। মীর জাফরকে সিংহাসন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মীর কাসিমকে বসালেন। মীর কাসিম ১৭৬৪ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন, যা বক্সারের যুদ্ধ নামে পরিচিত। তিনি হেরে গেলেন, এবং ব্রিটিশদের সামনে আর কোনো বাধা রইলো না। তারা কর আদায়ের নামে গোটা ভারতকে ছিবড়ে খেলো।

এতকিছুর পরেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছিলো। তখন ওয়ারেন হেস্টিংসকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হলো। তিনি একটা প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করলেন, এবং এভাবেই ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের পথ তৈরি হয়ে গেলো। যদিও সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হতে হতে চলে আসবে ১৮৫৭, এবং তখনকার সিপাহী বিদ্রোহ। সেই গল্প আরেকদিন।

Share:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *