ঘটনা ১
চোখেমুখে উত্তেজনা চেপে রাখার নিস্ফল চেষ্টা করে, বড় ভাই আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, “ঐ যে, আরেকটা মেয়ে আছে না? ওর নাম যেন কী? আসলে পড়ে কোথায়?”
আমরা যে ওনার উত্তেজনা বুঝতে পারছি, সেটা ওনাকে বুঝতে না দিয়ে আমরা কথাবার্তা চালাচ্ছিলাম, “কোন মেয়েটা?”
উনি চেয়েছিলেন আমরা সাথে সাথে বুঝে নেবো। তবু ঐ মেয়ে জাহান্নামে গেলেও ওনার যেন কিছুই যায় আসে না, এমন একটা ভাব ধরার চেষ্টা করে বললেন, “ঐ যে, স্বাস্থ্য একটু ভালো, গালে টোল পড়ে”
আমরা আগেই বুঝেছি উনি কার কথা বলছেন। দুইজনেই ওনার দিকে তাকালাম। এই বড় ভাই ডিভি পেয়ে আমেরিকায় এসেছেন, নিউ ইয়র্কে থাকেন। পেশার কথা না বলি, ওনার পরিচয় প্রকাশ করতে চাচ্ছিনা। এমনিতে হ্যাংলা পাতলা শরীর; বাসার মধ্যে স্যাণ্ডো গেঞ্জিতে আরো একটু দুবলা পাতলা দেখাচ্ছে।
টাইমস স্কয়ারে নিউ ইয়ারস ঈভ পালন করতে সারা আমেরিকা থেকে অনেকেই দলে দলে নিউইয়র্কে আসছিলো। আমেরিকাতে আসার পর, প্রথম ক্রিসমাসের ছুটিতে আমি আর আমার এক বন্ধু ঘুরতে গিয়েছিলাম নিউইয়র্কে। বাংলাদেশী কমিউনিটির অনেকের সাথেই দেখা হয়েছিলো তখন। হার্ভার্ড থেকেও বেশ কয়েকজন এসেছিলো। এর মধ্যে একটা মেয়েও ছিলো, যাকে দেখে এই বড় ভাই বেশ চঞ্চল হয়ে পড়েছিলেন।
ওনাকে আমরা গালে টোল পড়া মেয়েটার নাম বললাম, “ও আচ্ছা, ওর কথা বলছেন?”
উনি কিছুটা ধৈর্যহারা হয়ে বললেন, “আর পড়ে কোথায়?”
আমার বন্ধু সালমান উত্তর দিলো, “হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি”
ওনার মধ্যে নতুন করে কোনো ভাবান্তর দেখা গেলো না। আগের ভাবটা রেখেই বললেন, “হুম”
আমরা দুই বন্ধু খুব অবাক হয়ে একে অন্যের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম। হার্ভার্ড অনেক র্যাংকিং লিস্টেই পৃথিবীর এক নাম্বার ইউনিভার্সিটি। যে লিস্টে এক নাম্বারে নেই, সেই লিস্টের দুই থেকে পাঁচের মধ্যে হার্ভার্ডের নাম অবশ্যই আছে। বাংলাদেশ থেকে আসা ছাত্ররা তো বটেই, হার্ভার্ডে পড়ে শুনলে এমনকি আমেরিকানদেরও চোয়াল ঝুলে পড়ে। কিন্তু এই বড় ভাই কোনো পাত্তাই দিলেন না।
কয়েক মুহূর্ত বিরতি নিয়ে, ওনার সেই “কিছুই-যায়-আসে-না” ভঙ্গিতে ফিরে যাওয়ার জন্য অরণ্যে রোদন করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, “আর বাংলাদেশে থাকতে কোথায় পড়তো?”
আবারো সালমান উত্তর দিলো, “বুয়েটে”
এইবার ওনার চোয়াল ঝুলে পড়লো। চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। আর সাথে সাথে ওনার মুখ থেকে বুলেটের মত ছিটকে বেরিয়ে এলো, “বুয়েএএএএট!”
দ্বিতীয় দফায় মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম আমি আর আমার বন্ধু!
ঘটনা ২
বিকেলের দিকে একটা ছেলে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে সেলাম ঠুকলো। জুতো খুলে ভেতরে এসে বসতেই বললো, “ভাইয়া, আমি চিটাগাং ভার্সিটির স্টুডেন্ট, কিন্তু হায়ার স্টাডি করতে আমেরিকায় যাইতে চাই”
২০১২ সালের শুরুর দিকের কথা; আমি তখন বাংলাদেশে। নিজেও আমেরিকাতে পড়াশোনা করবো বলে চেষ্টা করছি। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া শেষ, পরীক্ষাগুলো (জিআরই, টোফেল) দিয়ে ফেলেছি, এপ্লাই করে ফেলেছি ভার্সিটিতে। নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য, অনলাইনে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা অর্জন করার পদ্ধতি নিয়ে লেখালেখি করছি। কিছু নাছোড়বান্দা পোলাপাইনের কবলে পড়ে চট্টগ্রামে একটা কোচিং সেণ্টারও খুলেছি। অনলাইনে এবং সামনাসামনি, এই ছেলের মত অনেককেই দেখি, যাদের ধারণা- তাদেরকে দিয়ে আমেরিকাতে পড়তে যাওয়া সম্ভব হবে না।
এই ছেলের কণ্ঠেও দ্বিধা। আমি উৎসাহ দিয়ে বললাম, “চমৎকার, বেশ ভালো চিন্তা। হোয়াই নট?”
ছেলেটা বেশ উদাসীন হয়ে পড়লো, “কিন্তু ভাইয়া, আমি তো বুয়েটের না”
আমি ওকে আশ্বস্ত করলাম, “আমিও কিন্তু চট্টগ্রাম ভার্সিটির ছেলে। তাহলে কি আমারো চেষ্টা করা বন্ধ করে দেয়া উচিৎ?”
ওর চেহারা দেখে বুঝলাম, ছেলেটা এই তথ্য জানতোনা। ও মনে করেছে, জিআরই- এর কোচিং সেণ্টার নিশ্চয়ই বুয়েটের ছেলেপেলেরাই চালায়। আমার কাছে সাজেশন চাইতে আসাটা ভুল হয়েছে সেই উপলব্ধি থেকেই হোক অথবা নিজের অজান্তেই সে আমাকে অপমান করে ফেলেছে সেই লজ্জা থেকেই হোক – সে চুপ করে থাকলো। তখন আমিই বলতে লাগলাম, “তুমি কি জানো যে এই সেণ্টারটা আমি আমার বন্ধু সালমান মিলে খুলেছি?”
সে কাঁচুমাচু করে জবাব দিলো, “না, ভাইয়া”
আমি আন্দাজ করেছিলাম। সে আরো একটা জিনিস জানে না, “তুমি কি জানো যে সালমান এখন আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ লুইজিয়ানাতে পিএইচডি করছে?”
সে আবারো না-সূচক মাথা নাড়লো। এবার বোমা ফাটিয়ে ওর দুনিয়া পাল্টে দেয়ার পালা, “সালমান অতীশ দীপংকর ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি থেকে ফার্মেসীতে অনার্স করেছিলো”
ওকে দেখে বোঝা যাচ্ছে, সে আসলেই বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “এখনো সন্দেহ আছে নিজেকে নিয়ে?”
এই পর্যায়ে গিয়ে ছেলেটা তার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার কথা, চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার মুখ আরো কালো হয়ে গেলো। বলতে লাগলো, “ভাইয়া, আমেরিকাতে একটা বড় ভাইকে ইমেইল করেছিলাম। কীভাবে উনি প্রসেসিং করেছেন, জানার জন্য। আমাকে কী করতে হবে জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি আমাকে লিখেছিলেন, ‘জিআরই এর নাম শুনসো? এইটা অনেক কঠিন। তুমি পারবা না এটা। চিটাগাং ভার্সিটির ছাত্র হয়ে এইসব চিন্তা করা বাদ দাও। বুয়েটে না পড়লে এসব হবে না। অন্য কিছু করার চিন্তা করো। সবাইকে দিয়ে কি সবকিছু হয়?’ জানেন ভাইয়া, আমার খুব খারাপ লেগেছিলো তখন। আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। বুয়েটে পড়িনি বলে কি আমার যাওয়া হবে না?”
কথাগুলো আমাকে বলতে গিয়ে সে আবারো প্রায় কেঁদে ফেলছিলো। সেই বুয়েটিয়ান যে-ই হোক না কেন, তার ওপর আমার প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হচ্ছিলো।
ঘটনা ৩
দেড় বছর পর আমেরিকাতে কাটানোর পর প্রথমবারের মত দেশে গেলাম ২০১৩ এর ডিসেম্বরে, দুই বন্ধু মিলে। কতদিন পর দেশের মাটিতে পা রাখবো! কতদিন পর বন্ধুদের সাথে গলা ফাটিয়ে গান গাইবো, আড্ডা দেবো! আর একটা দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে কিছু সেমিনার করবো হায়ার স্টাডির ওপর। তখন আবার বাংলাদেশে অবতাল (অবরোধ + হরতাল) চলছে। তাই, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা থেকে আমন্ত্রণ পাওয়া স্বত্ত্বেও যেতে পারিনি। ওদেরকে আশা দিয়ে রেখেছিলাম। কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি বলে বলে দুই বন্ধুরই মন খারাপ। শুধু চট্টগ্রামে করেছি চারটা। আর ঢাকায় করেছি একটা – বুয়েট এলাকার ফ্রেপড অডিটোরিয়ামে।
এর কয়েকদিন আগেই ফেসবুকে একটা মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিলো। বুয়েটে পড়ুয়া মেয়ে। ভোকাবিল্ডার বইটা আর ঐ বইয়ের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষকের ওয়েবসাইটে পাবলিশ করা ভিডিওগুলো ওর নাকি খুব ভালো লেগেছে, এজন্য রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলো। হাল্কা-পাতলা কথা হয়েছিলো আমাদের মধ্যে।
যাই হোক, ওর নাকি রিলেশনশিপের ঝামেলা চলছিলো। ছেলেও বুয়েটের। কথাপ্রসঙ্গে মেয়েটা বললো, বয়ফ্রেণ্ডের সাথে নাকি ওর একদিন কথা হয়, তো দশদিন ঝগড়া চলে। ভেঙ্গে দেয়াই নাকি সবচেয়ে ভালো হবে, বললো। আরো বললো, এমন সময়ে আমার সাথে পরিচয় হয়েছে যে ঐ ছেলের সাথে ব্রেকাপ হলে এখন নাকি বেশি কষ্ট পাবে না। আমি, ভালো বন্ধুর মত, সান্ত্বনা দিয়েছিলাম। পরামর্শ দিয়েছিলাম, ভালো করে ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার। পছন্দ করার মত মেয়ে, তাই আমিও কিছুটা উৎসাহ দিয়েছি, অস্বীকার করবো না।
সেই মেয়েটা এসেছিলো ফ্রেপড অডিটোরিয়ামের সেমিনারে। ঐদিনই আমাদের দেখা হয়েছিলো, ঐ একবারই। তেমন কোনো কথাও হয়নি। আমাদের মধ্যেও আর কিছু এগোয়নি। আমিও আমেরিকাতে ফিরে এসেছি দুদিন পর, ব্যস্ত হয়ে গেছি। এর মধ্যে ঐ ছেলের সাথে মেয়েটার সম্পর্ক পুনরায় জোড়া লেগে গেছে, যা বুঝলাম।
ছেলেটা আমাকে মেসেজ পাঠালো একদিন। জিজ্ঞেস করলো, আমার সাথে ওর গার্লফ্রেণ্ডের কী কী হয়েছে। মেয়েটা কতটুকু অনেস্টলি ওর বয়ফ্রেন্ডকে কী কী বলেছে, আমাকে কতটুকু নিচে নামিয়েছে, বা নিজেকে কতটা দোষী দেখিয়েছে – আমি কিছুই জানিনা। ভদ্রতা দেখাতে গিয়ে ছেলেটাকে ব্লক করলাম না শুরুতেই। এটা করলে হয়তো মেয়েটার প্রতি সে আরো সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতো। আমি তাই ছেলেটার কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বেশ ভদ্রভাবেই বললাম, “আমাদের মধ্যে কিছুই হয়নি, এবং অনেকদিন ধরে কোনো যোগাযোগও নেই। আর এটা আপনার এবং আপনার গার্লফ্রেণ্ডের ব্যাপার। প্লিজ, আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। ওকে জিজ্ঞেস করেননি? ও কী বলেছে?”
সে যদিও স্বীকার করলো যে, মেয়েটা জানিয়েছে- আমি প্রোপোজ করিনি, কিন্তু তারপরেও আমাকে মিথ্যা অভিযোগ করতে লাগলো। আমি যাই বলি, সে বিশ্বাস করে না। পরে বিরক্ত হয়ে যখন বললাম, “আমি অনেক ব্যস্ত, এবং আমাকে এসবের মধ্যে জড়াবেন না”
তখন সে আমাকে যা বললো, পড়তে পড়তেই আমার কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগলো। গালাগালি করে যা বলতে লাগলো, তার সারমর্ম হচ্ছে, আমার পার্সোনালিটি নাই, মাইয়্যার রিলেশনে প্রবলেম চলছে বলে প্রোপোজ করে দিসি। এরপরেই উঁচু হয়ে উঠলো তার বুয়েটিয়ান নাক – “৩য় সারির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পইড়া আসলে যা হয়, বুয়েটিয়ান মাইয়্যারে প্রপোজ করতে আসছে। বামন হয়ে চাঁদে হাত দেয়ার আগে এরপর একটু ভাইবা নিও”।
ওকে আর বলতে ইচ্ছে হয়নি, “এই ৩য় সারির বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলের স্পিচ শুনতেই কিন্তু তোমার প্রথম সারির বুয়েটিয়ান গার্লফ্রেণ্ড এসেছিলো।”
*****************************************************************
সমস্যা আসলে আমাদেরই। অনেক আগে থেকে আমরা বুয়েটকে এমন একটা স্থানে রেখেছি যে এটাতে পড়ুয়া ছেলেমেয়েদেরকে আমরা ভিনগ্রহের প্রাণী মনে করি। আমি নিশ্চিত, নিউইয়র্কের ঐ বড় ভাইয়ের মত অনেকেই আছেন, যাদের চোয়াল হার্ভার্ডের নাম শুনে ঝোলে না, বুয়েটের নাম শুনে ঝোলে। বিদেশে পড়তে আসা সবাই রেস্টুরেন্টে বাসন মাজে, আর বুয়েটে পড়ুয়া সবাই বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেমেয়ে – এমন ধারণার বশবর্তী মানুষ কম নেই বাংলাদেশে।
আমার সেণ্টারে এসে ছেলেটা যে মর্মান্তিক কাহিনী শুনিয়েছিলো, সেই কাহিনী কিন্তু তখন প্রথমবারের মত শুনছিলামনা আমি। এর আগেও বিভিন্নজনের কাছ থেকে এই গল্পের ভিন্ন ভিন্ন ভার্সন শুনেছি। ডায়লগ ভিন্ন ছিলো, কিন্তু কাহিনী এটাই। কেউ বাচ্চাদেরকে বোঝানোর মত করে বুঝিয়েছে যে বুয়েট-পড়ুয়া ছাড়া এটা কারো পক্ষে সম্ভব না…… কেউ স্যাটায়ার করে বলেছে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে। তুমি পারবে, কারণ তোমার আছে নিডো” (শুনতে অসম্ভব মনে হলেও এই লাইনগুলো বলেছে এক বুয়েটিয়ান)…… কেউ অপমান করে বলেছে, “স্বপ্ন লিমিটের মধ্যে দেখা উচিৎ”।
যতগুলো প্রাইভেট ভার্সিটির সেমিনারে বক্তৃতা করতে গিয়েছি, তত জায়গায় এই প্রশ্নটার সম্মুখীন হতে হয়েছে, “ভাইয়া, আমরা তো প্রাইভেট ভার্সিটির স্টুডেন্ট। আমাদেরকে কি নেবে? বুয়েট ছাড়া, এমনকি অন্যান্য পাবলিক ভার্সিটির ছেলেমেয়েরাও নাকি পারেনা?”
এই মানসিকতা বাংলাদেশীদের মধ্যে তৈরি হওয়ার পেছনে মূল কারণ কিন্তু বুয়েটিয়ানরাই। এটা অবশ্যই সত্যি যে, বুয়েট থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী আমেরিকাতে পড়তে যাচ্ছে। এবং এটাও সত্য যে, সব বুয়েটিয়ানরা একরকম নয়। সাহায্যের মন-মানসিকতা আছে অনেক বুয়েটিয়ানদের মধ্যেই। কিন্তু পাশাপাশি এটাও সত্যি যে, অন্যান্য ভার্সিটি থেকেও ছেলেমেয়েরা মাস্টার্স-পিএইচডি করতে আমেরিকাতে যাচ্ছে এবং অনেকেই নেগেটিভ এক্সপেরিয়েন্সের সম্মুখীন হয়েছেন বুয়েটিয়ানদের হাতে। যদি অন্যান্য ভার্সিটি থেকে কম যায়, সেটার পরোক্ষ এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে, প্রত্যক্ষ কারণ বুয়েটিয়ানরাই। ওরা একটা ধারা শুরু করেছে, কিন্তু আর কাউকে সেই বহতা ধারাতে হাত ধুতে দেবেনা, এমন মানসিকতা আছে অনেকের মধ্যে।
কেন এই মানসিকতা ধরে রেখেছে বুয়েটিয়ানরা? একে অপরকে সাহায্য করার মাধ্যমেই তো একটা জাতি ওপরের দিকে উঠবে। তাদের এই বুয়েটপ্রেমের কারণে তো দেশের অনেক মেধাবী সন্তান উৎসাহ হারায় এবং সর্বোপরি দেশের ক্ষতি হয়, এটা বোঝার বুদ্ধি নেই কেন বুয়েটে পড়ার পরেও? অন্যান্য ভার্সিটির ছাত্ররা যখন আমেরিকাতে পড়তে যায়, সেই উদাহরণগুলোর দিকে কেন ওরা অন্ধ?
আমাকে অপমান করা ঐ বয়ফ্রেণ্ড জানে না, আমার ইউনিভার্সিটি অফ আরকানসা’র প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কেউ বুয়েটও চেনে না, চিটাগাং ভার্সিটিও চেনে না। এই ছেলেও নিউইয়র্কের ঐ বড় ভাইয়ের মতই। আমেরিকান কোনো ইউনিভার্সিটিতে পড়েও আমি জাতে উঠতে পারিনি ওর চোখে। এই মানসিকতা কন্যার বাপ-মায়ের মধ্যেও দেখা যায় প্রায়ই। মেয়ের জন্য বুয়েটে পড়া ছেলে হলে যে আর কিছু লাগে না, সেটা নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। আমি আর লিখলাম না।
নিঃসন্দেহে ইউনিভার্সিটি অফ কানেটিকাটে পিএইচডিরত সাইদ ভাইয়ের মত মাটির মানুষও আছেন, যারা বুয়েটে পড়েছেন এবং সবাইকে উৎসাহ দিচ্ছেন নিজের মেধাকে কাজে লাগানোর জন্য। অথবা রাগিব ভাইয়ের মত মানুষ আছেন, যারা এমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন যেখানে অনেকের সাহায্য হবে। খুব আনন্দ নিয়ে বলতে চাই, ৩ বছর আগের চেয়ে এখনকার পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। তবে, তারপরেও অনেকের উঁচু নাক এখনো আছে। তাদেরকে বলি – প্লিজ, বিনয় করা ভালো, অহংকার ভালো না। এটা বোঝার চেষ্টা করবেন দয়া করে। কেউ যদি আপনার কাছে সাহায্যের জন্যে আসে, তাহলে সে মেনেই নিচ্ছে যে আপনি তার চেয়ে বেশি জানেন। তাদেরকে অপমান করা বা লজ্জা দেয়া ঠিক নয়।
আর যারা মনে করেন বুয়েট ছাড়া বাকি সব প্রতিষ্ঠান ভুয়া, তাদেরকে বলি – এতোটা একপক্ষীয় চিন্তাভাবনা করার কোনো কারণ নেই। সব জায়গার মতোই, ভালো স্টুডেন্টদের পাশাপাশি, ওখানেও প্রচুর মাথামোটা ছেলেমেয়ে আছে। ওখানেও অনেকেই আছে যারা ৩ এর নিচে সিজিপিএ আর জিআরই তে বেশ কম স্কোর নিয়ে আসে, হায়ার স্টাডি পসিবল কিনা জানার জন্য। ওখানেই কিন্তু কাঠবলদ ধর্মান্ধদের আড্ডা জমে। বাংলাদেশের অনেক ভার্সিটিতেই ভালো ভালো রিসার্চ হচ্ছে, শুধু বুয়েটে না। অনেক ভার্সিটির ছাত্র-শিক্ষকরাই আন্তর্জাতিক ভালো মানের (পিয়ার রিভিউড) জার্নালে আর্টিক্যাল ছাপাচ্ছেন, শুধু বুয়েটিয়ানরা ছাপাচ্ছে না। সম্মান দিন সবাইকেই, কিন্তু অতিভক্তি কোনো ক্ষেত্রেই ভালো না।
সবাইকে ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
রচনাকাল – ২০১৪
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটা ইতোপূর্বে সচলয়ায়তনে “উহু বুয়েট, আহা বুয়েট” শিরোনামে প্রকাশিত।
