
গ্রীক মিথলজির চোখ ধাঁধানো জগতে সবাইকে স্বাগতম। এই নোটের মধ্যে চেষ্টা করবো, পৌরাণিক দেবতা এবং আদি ঘটনাগুলোকে একটা সহজ ছকের মধ্যে নিয়ে আসার। কাজটা সহজ নয়, কারণটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। কিন্তু আশা করি, এই গঠনের মধ্যে পুরো ইতিহাসটা খুব সহজ হয়ে যাবে। আসুন তাহলে, শুরু করে দেই……
আদি দেবসত্তা (The Primordial Deities)
গ্রীক মিথলজিতে সৃষ্টিতত্ত্বে একদম শুরুতে ছিলো আকৃতিহীন, নিয়মহীন এক শূন্যস্থান। সেখানে প্রথমদিকে যে দেবতাদের উদ্ভব হয়েছিলো, তাদেরকে বলে আদি দেবসত্তা বা Primordial deities. এরা হচ্ছে প্রথম প্রজন্ম। এই আদি দেবসত্তাদের মধ্যে ছিলেন Gaia, Eros, Tartarus, Erebus, Nyx. এদের মধ্যে Gaia সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। তাকে নিয়ে আরো বিস্তারিত পড়তে পারবেন রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্সের লেখায়।

টারটারুসের নাম নিলাম আদি দেবসত্তাদের মধ্যে। ওর সাথে গায়ার একটা সন্তান ছিলো, নাম – টাইফন, ঝড়ের দেবতা। আরো কিছু সন্তান ছিলো – Ourea (পাহাড়ের দেবতা) আর Pontus (সমুদ্রের দেবতা)। ওদিকে সবার শেষে নাম নেয়া Nyx (রাতের বা অন্ধকারের দেবতা)-এর অনেক অশুভ সন্তান ছিলো যারা দোষারোপ, প্রতিশোধ, ধ্বংস, মৃত্যু, নিদ্রা, প্রতারণা, অশান্তির দেবতা ছিলো।
তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বংশধারাটা এসেছিলো গায়ার কাছ থেকে, তারই সন্তান Ouranos (অথবা Uranus) এর সাথে মিলনের মাধ্যমে। ইউরেনাস নামের অর্থ অন্তরীক্ষ, আকাশ, বা স্বর্গ।এদের সন্তান-সন্ততির মধ্যে থেকেই শুরু হলো দ্বিতীয় প্রজন্ম, যাদেরকে বলা হয় টাইটান। ইউরেনাসকে নিয়ে বিস্তারিত পড়তে পারবেন তাহসিন অর্থীর লেখায়।
দ্বিতীয় প্রজন্ম – দি টাইটানস

1. Cronus (অথবা Kronos) – তরুণ এই দেবতা ছিলেন প্রথমদিকের একজন টাইটান, এবং সকল টাইটানদের নেতা। বাবা-মা (ইউরেনাস আর গায়া, যদিও গায়া তার দাদীও হয় – যাই হোক)- এর কাছ থেকে ক্রোনোস জানতে পারে যে, ওর ছেলেই ওকে পরাজিত করে দেবাধিদেব হয়ে যাবে। তাই নিজের প্রথম ৫টা সন্তানকে সে গ্রাস করে ফেলে (মেরে ফেলেনি, গ্রাস করে ফেলেছিলো। এদের মধ্যে হেরা, হেইডিস, পসাইডনও ছিলো – এদের কথা পরে আসছে)।

এই ক্রোনোস – কে আবার অনেকে Chronos এর সাথে মিলিয়ে ফেলে। ঐ chronos হচ্ছে সময়ের দেবতা। আর এই Cronus তার বাবা ইউরেনাসকে উৎখাত করেছিলো। ক্রোনাসকে নিয়ে আরো বিস্তারিত পড়তে পারবেন নাবিদ এস সালমানের লেখায়।
2. Rhea – ক্রোনোসের বোন এবং স্ত্রী। হ্রিয়া নিজের সন্তানদেরকে ক্রোনোসের দ্বারা গ্রাস হয়ে যেতে দেখে শোকে আর প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিলো। সে গায়া (মা, শ্বাশুড়ি, এবং দাদী শ্বাশুড়ি)-এর সাথে প্ল্যান করে গোপনে জন্ম দেন যিউসের।
3. Themis – ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা ছিলো এই দেবীর। তাই তাকে ডেলফির মন্দিরে ভবিষ্যদ্বক্তাদের (oracles of Delphi) একজন করে নেয়া হয়।
4. Crius
5. Coeus – লেটো নামক দেবীর বাবা।
6. Phoebe – লেটো নামক দেবীর মা।
7. Iapetus – এটলাসের বাবা। এটলাসের কথা নিচে আসছে, [7.1] সেকশনে। আর ইয়াপিটাস বা জাপিটাস এর অন্য দুই সন্তান প্রমিথিউস আর এপিমিথিউস তো বেশ বিখ্যাত। প্রমিথিউসকে নিয়ে বিস্তারিত পড়তে পারবেন ইমরান নূরের লেখায়।
8. Oceanus – Pleion এর বাবা।
9. Tethys – Pleion এর মা।
10. Hyperion – ভাই ক্রোনোসের সাথে যুক্ত হয়ে বাবা ইউরেনাসকে উৎখাত করতে সহায়তা করেছিলো।
11. Theia – হাইপেরিয়ন আর থেইয়ার সন্তান হচ্ছে হেলিওস (সূর্য), সেলিন (চন্দ্র), আর ইওস (ভোর)
12. Mnenomosyne
এরা ছাড়াও ইউরেনাসের আরেকটা সন্তান আছে, ভালোবাসা আর সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতি। তার জন্মের গল্প খুবই অদ্ভুত।

গল্পটা হচ্ছে, তারই (ইউরেনাসেরই) পুত্র ক্রোনোস তার লিঙ্গ কেটে সমুদ্রে ফেলে দেয়। সেখান থেকে সমুদ্রে একটা ফেনা ওঠে, এবং সেই ফেনা থেকেই আফ্রোদিতির জন্ম হয়। আফ্রোদিতি নামের অর্থই হচ্ছে “ফেনা থেকে উদ্ভূত”। যাই হোক, আসুন, আমরা পরবর্তী (তৃতীয়) প্রজন্মের দিকে চলে যাই, যাদেরকে বলা হয় অলিম্পিয়ান।
তৃতীয় প্রজন্ম – দি অলিম্পিয়ান্স

1.1. Zeus – সবচেয়ে শক্তিশালী দেবতা, যাকে ক্রোনোসের কাছ থেকে লুকিয়ে জন্ম দিয়েছিলো হ্রিয়া। কোনো কোনো সংস্করণে বলা হয়, দাদী গায়ার কাছেই সে বড় হয়েছিলো। বড় হয়ে দাদীর কাছ থেকেই পাওয়া একটা অস্ত্র নিয়ে সে ক্রোনোসকে বাধ্য করলো, তার গ্রাস করা সকল সন্তান-সন্ততি (অর্থাৎ, যিউসের ভাইবোনকে) উগরে দিতে। তখন স্বর্গের দখল নিয়ে টাইটান আর অলিম্পিয়ানদের মধ্যে বিশাল একটা যুদ্ধ হয়, দশ বছর ধরে। সেই যুদ্ধকে বলা হয় Titanomachy. যুদ্ধে অলিম্পিয়ানদের জয় হয়, এবং সে স্বর্গের রাজা হয়ে অলিম্পাস পর্বতে আরোহণ করে।

যিউসকে বজ্রের দেবতা বলা হয়। বারোজন অলিম্পিয়ান আছে, যাদের অবস্থান ও সম্মান অন্যদের চেয়ে ওপরে (নিচে ওদের নাম এলে পাশে লিখে দেয়া হবে – ১২ জনের একজন)। যিউস তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।
1.2. Hera – ১২ জনের একজন। যিউসের বোন এবং স্ত্রী, বিয়ে এবং পরিবারের দেবী। ক্রোনোস আর হ্রিয়ার সবচেয়ে ছোটো মেয়ে। সারা জীবন পেইনে ছিলেন তার স্বামী যিউসের ব্যাপক লালসার কারণে! হেরাকে নিয়ে বিস্তারিত পড়তে পারবেন রিজওয়ানুর রহমান প্রিন্সের লেখায়।
1.3. Demeter – ১২ জনের একজন। উর্বরতা, কৃষি, ঋতু পরিবর্তন, আর প্রকৃতির দেবী। ডেমেটারের সাথেও যিউসের সন্তান আছে, নাম – পার্সিফোনি।
1.4. Hades – পাতালপুরীর দেবতা। মাউন্ট অলিম্পাসে থাকেন না বলে তাকে ১২ জনের মধ্যে রাখা হয় না। পাতালপুরীকে তার নামানুসারেই ‘হেইডিস’ ডাকা হয়।
1.5. Hestia – ১২ জনের একজন, তবে অনেকে এর নাম বাদ দিয়ে ডায়োনিসাস [1.1.7] এর নাম রাখে। গৃহস্থালীর শৃংখলার দেবী। এর ব্যাপারে বলার মত শুধু একটা জিনিসই আছে বলে মনে হচ্ছে – সকল বোনদের মধ্যে একমাত্র এর সাথেই যিউস সহবাস করেনি।
1.6. Poseidon – ১২ জনের একজন। সমুদ্র, ভূমিকম্প, আর জলোচ্ছ্বাসের দেবতা। তাকে নিয়ে বিস্তারিত পড়তে পারবেন নাবিদ এস সালমানের লেখায়।
এই প্রজন্মের মধ্যে আরো আছে –
5.1. Leto – Coeus [5] আর Phoebe [6] এর সন্তান। যিউসের শয্যাসঙ্গিনী। বোঝাই যাচ্ছে, হেরা একে দেখতে পারতো না।
7.1. Atlas – Iapetus [7] এর সন্তান। এই প্রজন্মের হলেও সে কিন্তু অলিম্পিয়ান ছিলো না। সে আর তার ভাই Menoetius টাইটানদের পক্ষ নিয়েছিলো। যুদ্ধে টাইটানরা হেরে যাওয়ার পর যিউস তাকে শাস্তি দেন। এটলাসের ওপর দায়িত্ব পড়ে, স্বর্গকে নিজের কাঁধে আগলে ধরে রাখার; যাতে স্বর্গ আর পৃথিবী যাতে আবার মিশে যেতে না পারে। এই মিথ নিয়েও মিথ আছে। অর্থাৎ, মিথের কাহিনী নিয়েও ভুল ধারণা আছে। সবাই মনে করে যে, এটলাসের কাঁধে পৃথিবী। আসলে কিন্তু তা নয়। এটলাসের কাঁধে আসলে অন্তরীক্ষ আর স্বর্গের জগত। এটলাসকে নিয়ে আরো পড়তে পারবেন ফারহানা সাদিকার লেখায়।

8.1. Pleion – Ocenaus [8] আর Tethys [9] এর সন্তান। এটলাসের ঔরসে আর প্লিইয়নের গর্ভে জন্ম নিয়েছিলো মায়া [7.1.1], যে আবার যিউসের শয্যাসঙ্গিনী।
…………………………… এবার আমরা চলে যাবো, আরেক প্রজন্মে। তবে এখানে মূলত যিউসের সন্তানদেরকে নিয়ে আলোচনা করা হবে। তাও আবার সকল সন্তানদের নিয়ে নয়। ওনার আরো অনেক সন্তান এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যৌথ পিতৃত্বও আছে। আপাতত এদেরকেই দেখি…
যিউসের উল্লেখযোগ্য সন্তান-সন্ততি

Zeus এর একটা অদ্ভুত কাহিনীর সন্তান আছে,
1.1.1. Atheny – ১২ জনের একজন। জ্ঞান, যুক্তি, বুদ্ধিমত্তা, সাহিত্য, সামরিক কলাকৌশল, বিজ্ঞানের দেবী। যিউস এথেনার মা-কে গর্ভবতী করে দেয়ার পর, কিঞ্চিৎ ভয় পেয়ে তাকে গিলে খেয়ে ফেলেছিলো। কতক কাল পরে, যিউসের কপাল “দরদ” অনুভূত হয় এবং কপাল ফুঁড়ে আথেনী জন্ম নেয়। তখনি সে পুরোপুরি প্রমাণ সাইজের মহিলা হয়ে জন্ম নিয়েছিলো। অনেকটা হিন্দু মিথলজির রাবণপুত্র মেঘনাদের মত। আথেনীর পরনে ছিলো যোদ্ধাদের বর্ম। আথেনীকে যিউস বিশেষ পছন্দ করতো বলে পুরাণে বর্ণিত আছে।

*** Zeus আর Hera [1.2] এর সন্তান
1.1.2. Ares – ১২ জনের একজন। যুদ্ধ, হিংসা, রক্তপাতের দেবতা। আফ্রোদিতির (সেই ইউরেনাসের ফেনা-সন্তান আফ্রোদিতির) স্বামী না হলেও Ares এর ঔরসে আফ্রোদিতির একটা সন্তান ছিলো, নাম – Eros. ও হ্যাঁ, আফ্রোদিতিও কিন্তু ১২ জনের একজন। এইরিসকে নিয়ে আরো পড়তে পারবেন নুজাহাত জাবিনের লেখায়।
1.1.3. Hephaestus – ১২ জনের একজন। নির্মাণবিদ্যার দেবতা। আফ্রোদিতির স্বামী। সবাই অনেক লালসাবাজ হলেও হেফাস্তুসের নামে এমন কোনো গল্প নেই। তার ব্যাপারে বিস্তারিত পড়তে পারবেন ফারহানা সাদিকা’র লেখায়।

*** Zeus এর সাথে Leto [5.1] এর সন্তান
1.1.4. Apollo – ১২ জনের একজন। শিল্প, চিকিৎসা, আলো, ভবিষ্যদ্বাণীর দেবতা। এপোলোকে নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন নাজমুল হাকিমের লেখায়।
1.1.5. Artemis– ১২ জনের একজন। এপোলোর যমজ বোন; শিকার, কুমারীত্ব, চাঁদের দেবী। আর্তেমিসকে নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন ফারহানা সাদিকা।

এপোলো আর আর্তেমিসের মা লেটোকে পেয়েছিলাম [5] আর [6] এর মধ্যে, Coeus আর Phoebe এর সন্তান হিসেবে।
*** Zeus এর সাথে Maia [7.1.1] এর সন্তান
1.1.6. Hermes – ১২ জনের একজন। প্রধানত ব্যবসার দেবতা, আর হিন্দু মিথলজির দেবর্ষি নারদের মত বার্তাবাহক।
হার্মিসের মা Maia ছিলেন Atlas [7.1] আর Pleione [8.1] এর সন্তান। এটলাস আর প্লিইয়নের মোট ৭টি কন্যা সন্তান ছিলো, মায়ের নামানুসারে ওদেরকে “প্লীডিস” ডাকা হয়। এই ৭ জনের মধ্যে মায়া ছিলো সবার বড়। এই ৭ বোনকে আকাশে যে নক্ষত্রমণ্ডলী হিসেবে স্থান দেয়া হয়েছিলো, তাকে প্লীডিস বলে। এটা নিয়ে আমার আরেকটা নোট আছে, শিকারী ওরায়ন আর প্লীডিসের ৭ বোন শিরোনামে।
*** Zeus এর সাথে Semele এর সন্তান
1.1.7. Dinoyssus – ওয়াইন, উৎসব, আর আনন্দের দেবতা। অনেকে হেস্টিয়া [1.5]-কে ১২ জনের মধ্যে রাখে না, ডায়োনিসাসকে রাখার জন্য। ডায়োনিসাসের মা Semele ছিলো মরণশীল মানুষ। Semele-ও হেরার হিংসা আর কূটনীতির শিকার হয়েছিলেন, মারাও গিয়েছিলেন। ডায়োনিসাস বড় হয়ে তাকে উদ্ধার করে মাউন্ট অলিম্পাসে নিয়ে আসে।
আশা করি, সকল মিথপ্রেমী বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন আমাদের প্রচেষ্টা। কেমন লাগলো জানায়েন।
আরো কিছু বংশলতিকা –
১) http://9gag.com/gag/azENomm?ref=fbp
২) http://www.theoi.com/Tree.html
৩) http://en.wikipedia.org/wiki/Family_tree_of_the_Greek_gods
This article was first published in my facebook page মিথলজি Mythology on August 31, 2015.
