আপনারা অনেকেই হয়তো Brad Pitt অভিনীত The assassination of Jesse James by the coward Robert Ford মুভিটা দেখেছেন। মুভিটা দেখার সময় আমি জানতাম না যে এটা সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বানানো। মুভিটা শেষ করার পরেই বুঝতে পেরেছিলাম। এতো চমৎকারভাবে বানানো একটা সিনেমা, মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ব্র্যাড পিটের জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয়গুলোর মধ্যে এটা একটা। তবে বেশ ধন্দের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম কাহিনীর মূল চরিত্র জেসি জেমসকে নিয়ে ভাবতে বসার পর।

কে এই জেসি জেমস?
জেসি জেমস, খুব অদ্ভুত একটা চরিত্র। হেন কোনো খারাপ কাজ নেই যেটা সে করেনি। হত্যা, ট্রেন লুট, ব্যাংক ডাকাতি, গুণ্ডা দল বানানো – সব করার পরেও সে জনতার কাছে হিরো ছিলো।

জেসির জন্ম ১৮৪৭ সালের সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখে, যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যে। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় সে একেবারেই কমবয়সী হবার পরেও কনফেডারেটদের দলের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলো। তার ভাই ফ্র্যাংক জেমসও ছিলো তার সাথে। এবং আমরা সবাই জানি যে কনফেডারেটরা ইউনিয়নের কাছে হেরে গিয়েছিলো। যুদ্ধের পরে সে এবং তার দল এই ডাকাতি আর লুট শুরু করেছিলো। দলের কেউ কেউ আইনের লোকদের হাতে ধরা পড়তো, কেউ মারা পড়তো, জেসি নতুন লোক সংগ্রহ করতো। ১৮৭৬ পর্যন্ত তার ভাই ফ্র্যাংকও খুবই সক্রিয়ভাবে দলের সদস্য ছিলো।
সে কেন বিখ্যাত ছিলো?
অনেকে দাবি করে যে সে নাকি কাল্পনিক চরিত্র রবিন হুডের মত ধনীদের কাছ থেকে লুট করে দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিতো। অথচ, ইতিহাসে এমন কোনো প্রমাণ নেই। তাহলে কেন সে সেলেব্রেটি হয়ে গিয়েছিলো? এটার পেছনে একটা কারণই যুক্তিযুক্ত মনে হয়। সেটা হচ্ছে – আমেরিকার দক্ষিণ অংশের অনেকেই কনফেডারেটদের পক্ষে ছিলো। এবং ইউনিয়নের (সোজা কথায়, উত্তরের সৈন্যদের) বিজয়ের পরে অনেক কনফেডারেটই মনের মধ্যে আক্রোশ চেপে রেখেছিলো।
একজন প্রাক্তন কনফেডারেট যখন সরকারী ট্রেন লুট করে বা সরকারী ব্যাংক লুট করে, তখন তাদের কাছে হয়তো মনে হয়েছিলো যে এখনো সরকারের বিরুদ্ধে কেউ না কেউ প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ এতে যে জনগণেরই ক্ষতি হচ্ছে, সেটার দিকে ওরা সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে রয়ে গিয়েছিলো। আমরাও যে এখনো কতজনের কত খারাপ কাজের দিকে সম্পূর্ণ অন্ধের মত আচরণ করি, সেটা যদি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেই, তাহলে বুঝবেন ঐ সময়ের লোকগুলোর চেয়ে আমরা আসলে আলাদা কিছু নই। এখনো কিন্তু অনেকের কাছেই জেসি জেমস একটা প্রতীকের মত- বিদ্রোহের প্রতীক, শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতীক, প্রতিষ্ঠান বিরোধী শক্তি। আর তার মৃত্যুর ঘটনাটা তাকে আরো বিখ্যাত করে দিয়েছিলো। সেটা নিয়ে লিখছি একটু পরেই।
কে তাকে হত্যা করলো? কে এই রবার্ট ফোর্ড?
ধরা পড়ে বা মারা গিয়ে দলের সদস্য কমে যাওয়ার পর নতুন সদস্য নিয়োগ দিলো জেসি। এরকমই দুজন সদস্য ছিলো দুই ভাই, চার্লি ফোর্ড আর রবার্ট ফোর্ড। চার্লি অবশ্য আগে যোগ দিয়েছিলো, রবার্ট পরে। জেসি আর তার ভাইয়ের ওপর পুরষ্কার ধার্য করা হয়েছিলো, তৎকালীন ৫০০০ ডলার করে। রবার্ট সেই পুরষ্কার সংগ্রহের লোভেই হয়তো মিসৌরির গভর্নরের সাথে গোপনে চুক্তি করেছিলো।

ঘটনার দিন, এপ্রিলের ৩ তারিখ, ১৮৮২ সাল। তখন দুই ফোর্ড ভাই জেসির সাথেই ওর বোনের বাসায় ছিলো। খবরের কাগজে জেসি জানতে পারলো, তার এক প্রাক্তন সংগী সরকারের কাছে নিজের দোষের কথা স্বীকার করেছে। জেসি জানতো, রবার্ট ফোর্ড এই খবরের কাগজ ওর আগেই পড়েছে। কিন্তু কেন জেসিকে এই ব্যাপারে কিছুই বললো না, তা চিন্তা করে সে সন্দিহান হয়ে পড়লো। কিন্তু সে কিছুই বললো না ফোর্ডকে। উল্টো ওর সামনেই নিজের রিভলবার খুলে সোফাতে রেখে, দেয়ালে ঝোলানো ছবির ধুলো মুছতে দাঁড়ালো। অর্থাৎ, তার মুখ/চোখ ফোর্ডের উল্টো দিকে ছিলো। এগুলো সবই রবার্ট ফোর্ডের জবানবন্দী থেকেই জানা গেছে।
পরের ঘটনা এমন – রবার্ট ফোর্ড জেসিকে বন্দী করেনি। বরং গুলি করে নিরস্ত্র জেসিকে মেরে ফেলেছিলো। জেসি কি জেনেশুনে এমন করেছিলো? সে কি আত্মহত্যাই করতে চেয়েছিলো? সে কি দেখতে চেয়েছিলো রবার্ট ফোর্ড (সংক্ষেপে বব ফোর্ড) ওকে গ্রেফতারের চেষ্টা করে কিনা? সে কি মৃত্যুকে মেনে নিয়েছিলো? নাকি গ্রেফতার করতে এলে প্রতিবাদ করবে বলে ভেবেছিলো? রিভলবার খুলে পেছন ফিরে দাঁড়ানোর পেছনে কী যুক্তি ছিলো আসলে? এগুলো আমরা আর কোনোদিনই জানতে পারবো না।
যাই হোক, জনগণ তখন রেগে গিয়ে ফোর্ড ভাইদের দুজনকেই হত্যাকারী হিসেবে দেখলো। পরে খুব ঘটনাবহুল একটা দিন গেলো – ফোর্ড ভাইদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হলো, তারা দোষ স্বীকার করলো, তাদেরকে ফাঁসির সাজা শোনানো হলো, এবং ঐ দিনেই মিসৌরির গভর্নর তাদের সাজা মওকুফ করে দিলো। অর্থাৎ, ফোর্ডের সাথে গভর্নরের যে চুক্তি হয়েছিলো, সেটা গ্রেফতারের চুক্তি ছিলো না, খুনের চুক্তিই ছিলো। সাধারণ জনতা সরকারের কাছ থেকে এ ধরনের কিছু আশা করেনি। এবং মূলত এই কারণেই জেসি আরো বেশি বিখ্যাত এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়ে গেলো।
পরবর্তীতে…
১) ফোর্ড ভ্রাতৃদ্বয় পুরষ্কারের কিছু টাকা নিয়ে শহর ছেড়ে দেয়। দুই ভাই মিলে একটা নাটকের আয়োজন করে যেখানে জেসিকে হত্যা করার দৃশ্যটা অভিনয় করে দেখানো হতো। জনতার একটা অংশ এখানেও তাদেরকে দুয়োধ্বনি দিতো।
২) বড় ভাইটা দু বছরের মধ্যেই আত্মহত্যা করে। ওর যক্ষ্মা ছিলো, তখন এটার কোনো চিকিৎসা ছিলো না। পাশাপাশি সে মরফিনের প্রতি আসক্ত ছিলো। বিষণ্ণতায় ভুগতো হয়তো।
৩) ছোটো ভাই রবার্ট ফোর্ড একটা মদের দোকান চালাতো। ১৮৯২ সালে এডওয়ার্ড ও’কেলি সেই দোকানে ঢুকে “হ্যালো, বব” বলে ওকে গুলি করে হত্যা করে। বিচারে ও’কেলির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলেও ৭০০০ মানুষ স্বাক্ষর করে গভর্নরের কাছে স্মারক লিপি জমা দিলে তিনি ও’কেলি-কে মুক্ত/ক্ষমা করে দেন।
