দাগ কেটে যাওয়া ১০টি সিনেমা

প্রথমেই একটা জিনিস পরিষ্কার করে নিতে চাই। এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় মুভিগুলোর তালিকা নয়, বরং আমার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে এমন কিছু মুভির তালিকা। দুটো তালিকা বেশ ভিন্ন, আবার বেশ কিছু মুভি দুই তালিকাতেই আছে। যাই হোক, শুরু করি। বিনোদন আর শিক্ষা, এই দুটো জিনিস আমার কাছে অনেকটা সমার্থক মনে হয়। এমন কোনো বিনোদন আমার সহজে পছন্দ হয় না, যার মধ্যে কোনো শিক্ষা নেই। আবার এমন শিক্ষাকেও খুব নীরস মনে হয়, যার মধ্যে কোনো বিনোদন নেই। বিনোদনের অনেক মাধ্যমের মধ্যে একটা হচ্ছে সিনেমা। সেই ছোটোবেলা থেকেই সিনেমা দেখছি, আর শিখেছিও অনেক কিছু। কোনো কোনো সিনেমা অবশ্যম্ভাবী হয়ে অন্যগুলোর চেয়ে বেশি দাগ কেটেছে মনে, দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে আমার চিন্তাচেতনার মধ্যে। এতোগুলো সিনেমার মধ্যে ১০টা নিয়ে লেখা অনেকটা অসম্ভব! তবু চেষ্টা করছি…

১) V For Vendetta

নিঃসন্দেহে এটাই আমার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে। যদিও আমার সবচেয়ে ফেভারিট মুভি লর্ড অফ দ্যা রিংস, কিন্তু সবচেয়ে ইনফ্লুয়েনশিয়াল এটাই।

ভবিষ্যৎ নৈরাজ্যময় ব্রিটেনের কাহিনী, যেখানে একজন হাই চ্যান্সেলর ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছে শান্তির আবরণের ঠিক নিচেই। এই অবস্থায় একজন এগিয়ে আসে, এই পরিস্থিতি পাল্টানোর জন্য। সে মুখোশ হিসেবে বেছে নেয় প্রায় ৪০০ বছর আগের একজন মানুষের চেহারাকে, যার নাম ছিলো গাই ফক্স। গাই ফক্স ব্রিটেনের পার্লামেন্ট উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো সমাজ পাল্টানোর উদ্দেশ্যে, কিন্তু সে ধরা পড়ে যায়। তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। মানুষকে মেরে ফেলা গেলেও তার আইডিয়াটাকে মেরে ফেলা যায় না। আর সেই আইডিয়াটাই এখন ফিরে এলো প্রায় চারশো বছর পর, এর প্রবল তোড়ে ভেসে যাবে দমন-পীড়ন নীতির চালিকাশক্তি।

এই সিনেমাটা এতোভাবে আমার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে যে বলার মত না। VocaBuilder নামে আমার একটা বই আছে, ভোকাবুলারি নিয়ে। সেটার প্রথম চ্যাপ্টার ছিলো এটা নিয়ে। অনুবাদকদের আড্ডা থেকে আমরা বিভিন্ন সিনেমার বাংলা অনুবাদ করে সাবটাইটেল বানাই, আর সেখানে প্রথম অনুবাদ করা মুভি ছিলো এটা। এমন আরো অনেক কিছু। প্রত্যেক বছর নভেম্বরের ৫ তারিখ এটা দেখা এখন ট্র্যাডিশন হয়ে গেছে।

এটার পুরো রিভিউ পড়ুন এখানে – V for Vendetta Video Blog.

২) The Lord of the Rings film trilogy

সবচেয়ে প্রিয় মুভি। এই মুভিটার ব্যাপারে বলা হয়, একমাত্র মুভি যেটা বইয়ের বিশালতাকে ধরতে পেরেছে। লাইন বাই লাইন মুখস্থ হয়ে গেছে, এতোবার দেখেছি মুভিটা। অবশ্য এই লিস্টের অনেক মুভির ক্ষেত্রেই এই কথাটা খাটে।

লেখক জে আর আর টোলকিন পুরো একটা বিশ্ব তৈরি করে ফেলেছেন এখানে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, বিভিন্ন রাষ্ট্র, একেবারে ভিন্ন কিছু প্রজাতি – আর তাদের মধ্যে অপার শক্তির প্রতীক হিসেবে আসে একটা আংটি। সিনেমার শুরুর দিকে এই আংটি থাকে এমন এক প্রজাতির কাছে, যাদের কাছ থেকে বড় বা মহান কিছু আশা করেনি কেউ। কিন্তু শীঘ্রই, এদের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে সকল জাতির ভবিষ্যৎ।

অনেকে এই সিনেমাটাকে কেন যেন বাচ্চাদের মুভি বলে। তারা কোনোভাবেই এই সিনেমাটার অন্তর্নিহিত গুরুত্ব ধরতে পারে না বলেই আমার ধারণা। ভালো-মন্দের যুদ্ধ আছে এতে, কথা সত্য। কিন্তু এর গুরুত্ব লুকিয়ে আছে বাস্তবের সাথে এর সামঞ্জস্যের মধ্যে, আমাদের মনের দ্বান্দ্বিকতার প্রকাশটাকে ফুটিয়ে তোলার মধ্যে, ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতীকী রুপায়নের মধ্যে। বন্ধুত্ব, ভালবাসা, রাজনীতি, মহাকাব্যিক নায়কদের যাত্রা, লোভ-লালসা, দুর্নীতি, সাহস, আত্মত্যাগ – কী নেই এতে!

Full Review – LORD OF THE RINGS TRILOGY: এখন পর্যন্ত আমার দেখা বেস্ট মুভি.

৩) The Matrix Trilogy

তখন এইচএসসি তে পড়তাম, জোরেসোরে ইংরেজি মুভি দেখা আরম্ভ করেছি কেবল। তখন এরকম কঠিন একটা মুভি দিয়ে আমার যাত্রা ভালোভাবে শুরু হয়। ইংরেজি মুভির দানবীয়তা বোঝার শুরু এটা দিয়ে। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সায়েন্স ফিকশনের লিস্ট করতে গেলে, যে কোনো লিস্টেই এটা ওপরের দিকে থাকবে।

মেশিনদের সাথে মানুষের যুদ্ধ নিয়ে অনেক ধরনের গল্প বলা হয়েছে। কিন্তু এটা একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা নিয়ে হাজির হয়েছে। এখানে দেখানো হয়েছে, মানুষের শরীর থেকে শক্তি সংগ্রহ করে মেশিনরা। কিন্তু এজন্য একটা কাজ জরুরি হয়ে পড়েছিলো। আর সেটা হলো, মনকে শরীর থেকে পৃথক করা। কারণ, মনকে যদি শরীর থেকে পৃথক করা না যায়, তাহলে কাউকেই বেশিদিন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আর তাই, মনকে অন্যদিকে সরিয়ে নেয়ার জন্য, ওরা একটা কৃত্রিম জগত তৈরি করলো, এবং মস্তিষ্কে সিগন্যাল দিয়ে বোঝানো হলো যে, সে এখন ১৯৯৯ সালে আছে। সেই কৃত্রিম জগতের নামই হচ্ছে ম্যাট্রিক্স। অথচ বর্তমান সময় হচ্ছে প্রায় ২২০০ সালের কাছাকাছি। একদল মানুষ আছে, যারা মেশিনদের এই খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলো। তারা এখন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে মেশিনদের সাথে, অন্যদেরকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে বিশেষ করে একজনকে মুক্ত করতে চাইছে। কারণ, ওর‍্যাকল নামে একটি ভবিষ্যদ্বক্তা বলেছে, সেই বিশেষ ব্যক্তিটির পক্ষে ম্যাট্রিক্সের মধ্যে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা সম্ভব। আর সেই ব্যাক্তিটি এখনো মেশিনদের কব্জায়, তার শরীর থেকে এখনো শক্তি সংগ্রহ করে যাচ্ছে মেশিনরা। ওর নাম নিও ওরফে থমাস এন্ডারসন।

এটার ভিলেইনের কথা মনে থাকবে সবসময়। তালিকার প্রথম মুভি ভি ফর ভেন্ডেটার কেন্দ্রীয় চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, সেই হিউগো উইভিং এখানে ভিলেইন এজেন্ট স্মিথের ভূমিকাতে ছিলেন। এটা দেখার পর থেকে, ঠিক এজেন্ট স্মিথের সুরে বন্ধুদেরকে “মিস্টার এন্ডারসন” বলে ডেকে উঠতাম সবসময়ই।

Full Review – THE MATRIX TRILOGY, অন্যতম সেরা সায়েন্স ফিকশন.

৪) Pirates of the Caribbean trilogy

অন্যতম প্রিয় একটা ফ্যান্টাসি মুভি পাইরেটস অফ দ্যা ক্যারিবিয়ান। শিক্ষক.কমে ভোকাবুলারির ওপর একটা কোর্স নিয়েছিলাম। ওখানে মজা করে সিনেমা, টিভি সিরিজ, বা মজার ঘটনা তুলে ধরে পড়াতাম। ঐ কোর্সের মধ্যে ওপরের তিনটা আর এই মুভি ট্রিলজি – এগুলোর রেফারেন্স যতবার ব্যবহার করেছি, তার কাছাকাছি মনে হয় অন্য কোনো মুভির রেফারেন্স আসেনি।

জলদস্যুদের ওপর খড়গহস্ত ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানি, আর এক অশরীরী জাহাজের গুজব নিয়ে শুরু হয় পাইরেটস অফ দ্যা ক্যারিবিয়ানের কাহিনী। সিনেমার সবচেয়ে মূল যে বৈশিষ্ট্যটা দিনশেষে আমাকে ভাবনায় ব্যস্ত রাখে সেটা হচ্ছে এখানে ভালো আর খারাপের কোনো সীমারেখা নাই। কে যে কখন কী করে বসে, কোনো ঠিক ঠিকানা নাই।

জনি ডেপের ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম এই সিনেমাটা দেখেই। এটার দ্বিতীয় পর্বে (ডেড ম্যানস চেস্টে) ডেভি জোনস যে স্টাইলে কথা বলতো, সেটার নকল করেছি কতবার!

Full review – Pirates of the Caribbean Trilogy Review.

৫) Old Boy

কেন্দ্রীয় চরিত্রটাকে সিনেমার একদম শুরুতেই একজন অপহরণ করে নিয়ে যায়, একটা কক্ষের মধ্যে আটকে রাখে। তাকে তার দোষও বলা হয় না, অন্য কোনো রকম অত্যাচারও করা হয় না। শুধু আটকে রাখা হয়েছে, ব্যস এটুকুই। সে জানে না, তাকে কতদিনের জন্য আটকে রাখা হয়েছে; কারো সাথে তার কোনো কথা হয় না। তার অপেক্ষা আর শেষ হয় না। এরপর একদিন, প্রায় ১ যুগেরও বেশি সময় পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এবার সে শুরু করে এক অন্বেষণ! সে খুঁজে বের করবে কে তাকে আটকে রেখেছিলো।

আমার দেখা প্রথম কোরিয়ান মুভি এটা। কোরিয়ানরা যে কী দুর্দান্ত, কী দুঃসাহসিক সিনেমা বানায়, তা আগে জানতাম না। এটা দেখে পুরা চক্ষু চড়কগাছ! একটা নতুন মাত্রা খুলে গেলো যেন! কেন দুর্দান্ত, কিভাবে দুর্দান্ত – এগুলো নিয়ে কিছু বলতে গেলে স্পয়লার হয়ে যাবে। তাই আর বেশি বলতে চাচ্ছি না।

বিঃদ্রঃ ওপরের সবগুলো (১১টা) মুভির বাংলা সাবটাইটেল অনুবাদকদের আড্ডা থেকে রিলিজ দেয়া হয়েছে।

৬) A Clockwork Orange

স্ট্যানলি কুব্রিকের সাথে প্রথম পরিচয় এই মুভির মাধ্যমে। শব্দের কী ব্যবহার! এমন এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে মুভির মধ্যে, যেগুলো সাধারণ ডিকশনারির মধ্যেও নেই। Urban Dictionary এর ওয়েবসাইট খুলে রেখেছিলাম একটা ট্যাবে, আর সিনেমাটা দেখেছিলাম। সিনেমার কাহিনী নিয়ে বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে। আবার “বলার কিছু নাই, এটা দেখতে হবে” বললেও কোনো ভুল হয় না। এটার লেখকের জীবনে বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছিলো; বিশেষ করে তার স্ত্রীর সাথে। সেই ঘটনাটা নিঃসন্দেহে লেখকের মনে অনেক গভীরভাবে দাগ কেটেছিলো।

লেখক ভাষাবিদ ছিলেন, তাই শব্দ নিয়ে ইচ্ছে করেই খেলেছেন! শব্দের প্রতি আমার সখ্যতা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অন্যান্য মুভির পাশাপাশি এই মুভিটাও অনেক ভূমিকা রেখেছিলো। আর দেখেছিলাম কুব্রিকের জাদু। এরপর তো একে একে কুব্রিকের অনেক মুভিই দেখা হয়েছে। তার মুভিগুলো যে কতজনকে কতভাবে কত কিছু করতে অনুপ্রাণিত করেছে, তা আর বলতে!

৭) Life Is Beautiful

যেমন হাসিয়েছে, তেমন কাঁদিয়েছে মুভিটা। মনে থাকবে সবসময় মুভিটার কথা! ইটালিয়ান এই মুভিটা ছিলো কমেডির সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। কমেডি বলতে আমরা শুধু হাসিই বুঝি; আর হাসি এখানে ছিলোও, কথা ঠিক। কিন্তু যারা শেকসপিয়ারের কমেডির সাথে পরিচিত, তারা জানেন, জীবন যখন আপনাকে নিয়ে হাসাহাসি করে, সেটা হচ্ছে কমেডি। আর এখানে সেটার চিত্রায়ন দেখবেন চোখ ভরা জল নিয়ে।

৮) Children of Heaven

হাই স্কুলে থাকতে অনেকবার দেখেছিলাম মুভিটা। কেমন যেন অদ্ভুত রকম প্রশান্তি আসতো মুভিটা দেখলে। দুই ভাই-বোন আর এক জোড়া জুতোর কাহিনী, অনেকেরই মনে হয় দেখা আছে ইতোমধ্যেই। নিম্নবিত্ত পরিবারের মধ্যে দুটো ছেলেমেয়ের আনন্দ লাভের কী স্বর্গীয় প্রচেষ্টা!

৯) জীবন থেকে নেয়া

আমার কাছে বেস্ট বাংলা মুভি এটাই। খুব ছোটোবেলায় প্রথমবার দেখেছিলাম, এবং রুপকের সংজ্ঞা বুঝেছিলাম এটা দেখে। ইংরেজি মুভি তো বাংলা করিই, অনেকেই করছে এখন। কিন্তু আমার ইচ্ছে আছে, এই ধরনের মুভিগুলোকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে পৃথিবীর সবাইকে দেখানো। বড় হয়ে এই সিনেমাটা আবার দেখার পর পরিচালক জহির রায়হানকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলাম। এরপর দেখলাম, ঐ লোকের কাহিনীও কোনোভাবেই সিনেমার চেয়ে কম না। তার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো আল বদর বাহিনী, ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর। দেশ স্বাধীন হবার পর ভাইকে খুঁজতে সবদিক চষে বেড়ালেন জহির রায়হান, এবং একদিন নিজেই প্রাণ হারালেন। এটা নিয়ে সিনেমা বানানোর জন্য আমার পরিচালক বন্ধুদেরকে অনুরোধ করেছিলাম, একজন স্ক্রিপ্টের জন্য গবেষণার কাজ শুরু করেছেন। সিনেমাটা কখন আসবে জানি না, কিন্তু আমি অপেক্ষা করছি অধীর আগ্রহে।

১০) Taxi Driver

আমার সবচেয়ে প্রিয় পরিচালক মার্টিন স্করসেসি। ওর বানানো মুভিগুলোর মধ্যে যদিও Aviator সবচেয়ে প্রিয়, কিন্তু সবচেয়ে ইনফ্লুয়েনশিয়াল মুভি এটা। অনেক ভাবিয়েছে, অনেক কিছু চিন্তা করিয়েছে এই মুভিটা। সিনেমার পর্দার কিংবদন্তী অভিনেতা রবার্ট ডি নিরোর উপস্থিতি, শক্তিমান পরিচালকের দক্ষতার মিশেলে অত্যন্ত চমৎকার একটা মুভি, Taxi Driver.

হাজার হাজার মুভির মধ্যে ১০টার (ট্রিলজির বাকিগুলো সহ হিসেব করলে ১৬টার) নাম নিলে আরো অনেকের প্রতি অন্যায় হয়ে যায়। তাই, আরো কিছু মুভির নাম নিতে চাই – Taare Zameen Par, Lagaan, Mughal-e-Azam, Sholay, ওরা ১১ জন, Sex and Lucia, Amélie, Nymphomaniac, Mohabbatein, Gladiator, Brave heart, Raging Bull, The Good, the Bad and the Ugly, Million Dollar Baby.

Share:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *