লর্ড অফ দ্যা রিংস ট্রিলজি (সবচেয়ে প্রিয় মুভি)

দ্যা সানডে টাইমসে ১৯৬৬ সালে একটা লেখা এসেছিলো, ইংরেজী ভাষাভাষীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে- যারা লর্ড অফ দ্যা রিংস এবং হবিট পড়ে ফেলেছে, আর যারা এটা পড়তে যাচ্ছে। সোজা কথায়, এটার কথা শোনেনি, এমন কেউ নেই। আর LORD OF THE RINGS হচ্ছে এমন এক মুভি, যেটা বইয়ের রস প্রায় পুরোপুরি আস্বাদন করাতে পেরেছে দর্শকদেরকে। বই থেকে এডাপ্ট করা অন্য কোন মুভি বইয়ের স্বাদ এভাবে তুলে আনতে পারেনি। তাই আমি একটুও অবাক হইনা যখন একটা ট্রিলজি ১৭টা অস্কার বাগিয়ে নেয়, অথবা সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ট্রিলজি হয়ে ওঠে!

একটা মন্তব্য চোখ বন্ধ করে করা যায়- টকিয়েন’এর লেখা এই কাহিনীর চেয়ে শক্তিশালী, ইনফ্লুয়েনশিয়াল, ব্যাপক কাহিনী গত কয়েকশো বছরে আসেনি। এ ধরনের ব্যাপ্তিসমৃদ্ধ কাহিনীর সাথে তুলনা করা যায় কেবল হোমারের লেখা ইলিয়াড, অথবা কথিত ব্যসদেবের মহাভারতের সাথে। রাওলিং এর হ্যারি পটার, সি এস লুইসের নার্নিয়া, পাওলিনির এরাগন বা এ জাতীয় কোন মহাকাব্যই লর্ড অফ দ্যা রিংস এর প্রভাব থেকে বের হতে পারেনি। বিশেষ করে হ্যারি পটারের কত কত উপাদান যে এই কাহিনী থেকে নেয়া, মিলিয়ে দেখতে গেলে অবাক হতে হয়- এমনকি রাওলিং নিজেও সেটা অস্বীকার করেন না।

অনেকেই জাস্ট এটাকে নিছক বিনোদন হিসেবেই দেখে। কিন্তু এটার ভেতরে যে কি পরিমাণ ধূর্ততা আছে, কল্পনাই করা যায় না। কাহিনীর অধিকাংশ অংশই লেখা হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টাতে। তাই বিভিন্ন সমালোচকদের আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাবলীর সাথে এই বইয়ের কাহিনীর তুলনা। রিং-টাকে বোঝানো হয়েছে পারমাণবিক শক্তির মত ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কোন ক্ষমতা বোঝাতে। এমন ক্ষমতা যদি ভয়াবহ কারো হাতে পড়ে, তাহলে কি ভয়ানক ঘটনা ঘটতে পারে, সেই কাহিনীর প্রতীকি চিত্রায়ন করা হয়েছে লর্ড অফ দ্যা রিংস-এ।

চারটা ভিন্ন প্রজাতিকে তুলে ধরা হয়েছে এই বিশাল মহাকাব্যে। ফর্সা, তীক্ষ্ণদৃষ্টিসম্পন্ন, প্রাকৃতিক নিয়মে মৃত্যু হয়না এমন Elf; খর্বকায়, খননকাজে বিশেষ দক্ষ Dwarf; মরণশীল সাধারণ মানুষজাতি (Men); এবং বেঁটে, প্রকৃতিপ্রেমী, অজাতশ্মশ্রু Hobbit. এছাড়া টকিয়েন আরো তৈরি করেছেন Orc, Urukhai, Goblin, Ents etc. প্রত্যেকটা জাতিকে অসাধারণ ভাবে চিত্রায়ন করা হয়েছে এই ট্রিলজিতে। কস্টিউম, মেকআপ, স্বভাব, আচার-ব্যবহার – সবকিছু গভীরভাবে স্টাডি করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রুপালী পর্দায়।

THE FELLOWSHIP OF THE RINGS (First part of the Trilogy)

নিজেদের গ্রাম হবিটন-এ সমস্যাহীন গা-ছাড়া জীবনযাপন করছিলো হবিট’রা, বাকি দুনিয়ার ব্যাপারে একেবারেই নিঃস্পৃহ। বাকি দুনিয়াও হবিটদেরকে নিয়ে মাথা ঘামায় না। কিন্তু এই হবিটনের কোন একজন হবিটের কাছে এমন একটা কিছু আছে, যেটা খুব দ্রুতই সকল জাতির মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে – বিলবো ব্যাগিন্স এর ম্যাজিক রিং……

প্রায় তিন হাজার বছর আগের এক যুদ্ধে Men এবং Elf দের কাছে ডার্ক লর্ড Sauron এর পতন হয়। সেই সাথে হারিয়ে যায় তার বানানো সেই আংটি, যার মাধ্যমে সে পুরো পৃথিবীকে নিজের পদতলে নিয়ে আসতে পারতো। ঘটনাচক্রে সেই আংটি এখন বিলবো ব্যাগিন্স এর কাছে। সেই কাহিনী জানতে হলে পড়তে হবে The Hobbit, অথবা দেখে নিতে পারেন The Hobbit: An unexpected Journey. কিন্তু আমাদের কাহিনী তার ভাতিজা ফ্রোডো ব্যাগিন্স এর যাত্রা নিয়ে। তাকে যেতে হবে মর্ডরে, এই আংটি ধ্বংস করতে। কারণ, ডার্ক লর্ড আবারো ফিরে এসেছে। শরীর এবং পূর্ণ শক্তি ফিরে পেতে হলে তার দরকার এই আংটি।

ফ্রোডো এই যাত্রায় একা নয়। তার পথের সঙ্গী হলো জাদুকর গ্যান্ডালফ, Men-দের মুকুটহীন রাজা এরাগর্ণ সহ আরো একজন Men, তীরন্দাজ এলফ লিগোলাস, ডোয়ার্ফ গিমলি, আরো তিনজন হবিট-যাদের মধ্যে একজন ফ্রোডো-র বাগানের মালী স্যাম গ্যামজি। শুরু হয়ে গেলো তাদের কাফেলা – The fellowship of the ring.

আগেই বলেছিলাম হ্যারি পটারের ওপর লর্ড অফ দ্যা রিংস এর ইনফ্লুয়েন্স নিয়ে। একটু আলোচনা করা যাক, দুই কাহিনীতেই ডার্ক লর্ড আছে এবং তার পতন হয় কাহিনীর শুরুতেই। সে আবার পূর্ণ শক্তিতে ফিরে আসার চেষ্টা করে এবং ফিরে আসার জন্যে তার প্রয়োজন হয় এমন একটা জিনিস যা আছে কেন্দ্রীয় চরিত্রের কাছে। লর্ড অফ দ্যা রিংস এর গ্যান্ডালফ আর হ্যারি পটারের ডাম্বলডোর, দুজনের appearance and role- দূটোই সদৃশ। দুজনেই আবির্ভূত হন উদ্ধারকর্তা হিসেবে। হ্যারির সঙ্গী রন আর ফ্রোডোর সঙ্গী স্যাম, দুজনের রোল প্রায় একই রকম। Whatever happens, they will never leave each other. আচ্ছা, হ্যারির সবুজ চোখ কি ফ্রোডোর সবুজ চোখ থেকে একটুও ইন্সপায়ার্ড নয়?

THE TWO TOWERS (Second part of the Trilogy)

নিজের আর্মি বানানোর জন্য কিছু এলফ ধরে নিয়ে এসেছিলো Sauron. তারপর তাদেরকে অত্যাচার করতে করতে, তাদের স্বত্ত্বাকে বিষাক্ত করে তুলেছিলো সে। ধীরে ধীরে তারা পরিণত হলো Orcs এ। তবে Orcs-দের একটা সমস্যা ছিলো, তারা সরাসরি সূর্যের আলোয় বের হতে পারতোনা, সেজন্যে মর্ডরের আকাশ ছেয়ে দিতে হয়েছিলো কালো মেঘে। কিন্তু এবার আর সে ধরনের কোন সমস্যা রইলোনা। আরেক জাদুকর Saruman অর্কদের সাথে গবলিনের সংকরায়ন করে বানিয়েছে একটি নতুন প্রজাতি – Urukhai. Saruman-ও হাত মিলিয়েছে Sauron এর সাথে, তবে সে নিজেও আংটির খোঁজে বেরিয়েছে, Urukhai দের কে দায়িত্ব দিয়েছে সেই হবিটকে ধরে নিয়ে আসার জন্য। যদিও ফেলোশিপেই এই ধাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিলো, Two Towers-এ শুরু হয় এই ইঁদুর-বিড়ালের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া……

কাহিনীর পরিসর আরো বড় হয়ে যায় এই পর্বে এসে। Men দের আরেকটি রাজ্য রোহান উরুখাইদের যন্ত্রণায় খুবই করুণ অবস্থায় দিন গুজরান করছে। রোহানের রাজাকেও বশ করে রেখেছে সেই উইজার্ড। যুদ্ধ কড়া নাড়ছে রোহানের দরজায়। অসম এক যুদ্ধ……

ট্রিলজির বাকি দুটো পার্টের মত এটাও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টে অস্কার পেয়েছিলো। বাকি দুটো বেস্ট অরিজিনাল স্কোরের জন্য অস্কার পেলেও এটা পেয়েছিলো সাউন্ড এডিটিং এর জন্য।

THE RETURN OF THE KING (Third part of the Trilogy)

আড়াই হাজার বছর আংটিটা পানির নিচে ছিলো। সেখান থেকে সেই রিং পেয়েছিলো ডিগল নামের এক হবিট। রিং-টার একটা বিশেষ ক্ষমতা হলো, যে-ই এটাকে দেখবে, সে-ই এটা নিজের করে পেতে চাইবে। আংটির এই লোভে ডিগল-কে হত্যা করে সেই রিং ছিনিয়ে নেয় তারই বন্ধু স্মিগল। বইয়ের কাহিনী অনুসারে, স্মিগল এরপর চুপিচুপি নিজেদের বাসায় যায়। সেখানে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে শোনে, সবাই তার কু-কীর্তির কথা জেনে তাকে ঘৃণা করছে। তাই সে সবার অগোচরে চলে গেল Misty mountain এর গুহায়। আংটিটা থাকার বদৌলতে স্মিগল অস্বাভাবিক দীর্ঘায়ু লাভ করলো। কিন্তু আংটিটা তার ভিতরে একটা দ্বৈত স্বত্ত্বা তৈরি করেছিলো, তার ভেতরের ভালো মানুষটা আংটিটাকে ঘৃণা করতো, আবার নষ্ট সত্তাটা আংটিটাকে ভালোবাসতো……

বিলবো ব্যাগিন্স ৫০ বছর আগে Misty Mountain এর গুহায় পেয়েছিলো সেই আংটি। সে চাইলে তখন স্মিগলকে হত্যা করতে পারতো। কিন্তু স্মিগলের ভূমিকা এই কাহিনীতে আরো বাকি ছিলো। এই ৫০ বছর আংটিটাকেও খুঁজে বেড়িয়েছে স্মিগল। ফার্স্ট পার্টেই সে ফেলোশিপের পিছু নেয়, টু টাওয়ার্স-এ ফ্রোডোর মুখোমুখি হয় স্মিগল, আর রিটার্ন অফ দ্যা কিং-এ এসে সে পরিণত হয় অন্যতম চমকপ্রদ একটা চরিত্রে।

কাহিনীর ব্যাপ্তি আরো বেড়ে যায় এই অংশে এসে। গোটা মিডল আর্থ দুই পক্ষে ভাগ হয়ে যায়। কেউ Sauron এর পক্ষে, তো কেউ তার বিপক্ষে। দুইপক্ষে শুরু হয়ে যায় মহাকাব্যিক বিশ্বযুদ্ধ। যেমনটা আগেও বলেছি- এই যুদ্ধের বর্ণনার সাথে তুলনা চলে শুধুমাত্র ইলিয়াডের গ্রীক-ট্রয় যুদ্ধের অথবা মহাভারতের কৌরব-পাণ্ডব যুদ্ধের সাথে। আদতে এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেই। Men-দের দুই রাজ্য Rohan এবং Gondor কে ধরে নেয়া যায় সোভিয়েত এবং ব্রিটিশ-আমেরিকা মিত্রপক্ষের সাথে। আর Sauron এবং Saruman কে তুলনা করা যায় ইটালি এবং জার্মানীর সাথে।

রিটার্ন অফ দ্যা কিং ছাড়া, ১১টা অস্কার পাওয়া মুভি ইতিহাসে আছে আর মাত্র দুটো – Titanic এবং Ben Hur. আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, বাকি দুটোর কোনটাই রিটার্ন অফ দ্যা কিং এর পারফেকশনের কাছাকাছিও যেতে পারেনি। মুভিটার শেষ ২৫ মিনিটের বেশ কয়েকটা দৃশ্য এমন ছিলো, যার পরেই THE END লেখা উঠে যেতে পারতো। কিন্তু যে দৃশ্যটা দিয়ে শেষ হলো, এর চেয়ে better কিছুই হতে পারতোনা।

Over The Trilogy, Over Again

এই ট্রিলজির সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিলো স্ক্রীনপ্লে বা চিত্রনাট্য। And the team did a hell of a job. Howard Shore এর মিউজিক ছিলো প্রত্যেকটা দৃশ্যের জন্য যথার্থ, ঠিক যেখানে যেমনটা চাই।

আমরা যখন এ ধরনের কোন এপিক মুভি দেখা আরম্ভ করি, তখন আমরা আগে থেকেই অনুমান করতে পারি, ভালো পক্ষের জয়, মন্দের পরাজয় ঘটবে। কিন্তু কিভাবে ঘটবে, শেষ পর্যন্ত মূল চরিত্রগুলোর কপালে কি ঘটবে, সেগুলোই তখন মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আর এতো বিশাল ব্যপ্তির কাহিনী, যেখানে মূল চরিত্রের সংখ্যাই দশের ওপরে, তখন আগ্রহটা মায়ার মত জাল ছড়াতে থাকে।

বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয় বারবার উঠে এসেছে এই কাহিনীতে। রাষ্ট্রীয় সমাজ ব্যবস্থা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় শত্রুতা ও মিত্রতা, কূটনীতি সাম্রাজ্যবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের প্রতিরোধ, শিল্পায়ন ও পরিবেশ দূষণ – এসব ব্যাপারকে কাহিনীর মধ্য দিয়ে রুপকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। খুবই দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলোও, যেমন- জীবনদর্শন, বন্ধুত্ব, অসহায়ত্ব, অনুশোচনা, ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি। সোজা কথায়, লিজেন্ড হিসেবে একটা মুভিকে হাজির করার জন্য এবং দর্শকদের সাথে প্রত্যেকটা চরিত্রের ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরির জন্য যা যা প্রয়োজন, সবই আছে এই ট্রিলজি তে। তাদের ঠোঁট প্রসারিত হলে আপনিও হাসবেন, তাদের চোখ থেকে জল গড়ালে আপনারও চোখ ঘোলা হয়ে আসবে।

এখন পর্যন্ত আমার দেখা সেরা মুভি লর্ড অফ দ্যা রিংস। জানি, আপনারা অনেকেই মুভিটা দেখে ফেলেছেন অনেক আগেই। হয়তো তখন মনে হয়েছিলো, “হুম, ভালো মুভি, কিন্তু লাইফের বেস্ট মুভি না”…… তাদেরকে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে একটা ঘটনা বলছি, আমার একটা বন্ধু কোনভাবেই এক মুভি দুইবার পক্ষপাতী না। সে ছয় বছর আগে এই ট্রিলজি দেখেছে, কিন্তু এটা তার দেখা বেস্ট মুভি না। জাস্ট আমার পীড়াপীড়িতে আবার দেখলো, and he proudly admits now that, this is the best movie he has ever seen. আপনিও আবার বসে যান, হয়তো নতুন করে আবিষ্কার করবেন লর্ড অফ দ্যা রিংস’কে।

বিঃ দ্রঃ অনুবাদকদের আড্ডার আয়োজনে এটার তিন পর্বেরই extended edition এর বাংলা সাবটাইটেল করেছিলাম। আশা করি, ভালো লাগবে। সেগুলো দেখতে চাইলে ক্লিক করুন এই লিংকে – পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩.

Share:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *