গান সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা ০১ – মৌসুমী ভৌমিকের গানের সাথে কাটানো কৈশোর

আবার যেদিন তুমি সমুদ্র স্নানে যাবে
আমাকেও সাথে নিও, নেবে তো আমায়?
বলো, নেবে তো আমায়?

স্বপ্ন দেখবো বলে গানটির মধ্যে এতো আবেগ নিয়ে মৌসুমী ভৌমিক অনুরোধ করেন তাঁকে সাথে নেয়ার জন্য, প্রথমবার শুনে বলে উঠেছিলাম, “তোমাকেই নেবো, শুধু তোমাকেই নেবো”…….জীবনকে যে মৌসুমী এতো গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে, সেটা তার গানের কথা আর সুর শুনলে স্পষ্ট বোঝা যায়। এই গানটাতে নতুন এক সমাজের স্বপ্ন দেখার জন্য হাত পেতেছেন তরুণদের কাছে।

001-posts

যেভাবে শুরু

কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে সবে ভিক্টোরিয়া কলেজে উঠেছি। সায়মন হোটেলে রেগুলার আড্ডা চলে আমাদের। এমনই একদিন বসে চা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিলাম বন্ধু নিসর্গ, ইমন, আর ফখরুলের সাথে। স্কুলের আরেক বন্ধু শোয়েব ম্যাট্রিকের পর ঢাকায় নটরডেমে পড়তে চলে গিয়েছিলো। ছুটিছাটাতে কুমিল্লায় আসতো। এমনই এক ছুটিতে কুমিল্লায় এসে সায়মন হোটেলের আড্ডায় যোগ দিলো। সাথে ছিলো ভারতীয় আধুনিক বাংলা গানের একটা এমপিথ্রি। ঐ সিডিতে দুইশোটার ওপরে গান ছিলো। শোয়েব বিশেষ করে মৌসুমী ভৌমিকের গানগুলো (এলবাম – এখনো গল্প লেখো) শুনতে অনুরোধ করেছিলো। এরপর থেকে কলেজ জীবনের পুরো সময়টা মৌসুমী আমাদের পুরো গ্রুপের সাথেই জড়িয়ে ছিলেন। এমনকি আমাদের কিছু কিছু প্র্যাকটিক্যাল জোকও ওনার গাওয়া গানগুলো নিয়ে হতো। বিশেষ করে, ফুটপাতের মেয়ে গানটা নিয়ে কী কাহিনীটাই না আমরা করেছি!

বিতর্ক পরিষদে নিয়মিত বিতর্ক শিখতে যেতাম। সেখানে সনাতন বিতর্কের পাশাপাশি অদ্ভূত অদ্ভূত বিতর্কের ধরন সম্পর্কে জানছিলাম। একটা বিতর্ক এমন ছিলো যেখানে শেষের দিকে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজবে। আমরা ঠিক করলাম মিউজিকের জায়গায় একজন চাপা স্বরে গান গাইবে, সেই গানটা ছিলো মৌসুমী ভৌমিকের স্বপ্ন দেখবো বলে। পরিষদের এক সদস্য সীমু দিদি বেশ ভালো গান গাইতেন, ওনার কণ্ঠে গানের শেষের হামিং টা এতো চমৎকার লাগতো!

ইন্টারের পর কুমিল্লা থেকে ঢাকায় যখন কোচিং করতে গিয়েছিলাম (আসলে কি করতে গিয়েছিলাম কে জানে, পড়াশোনা তো করিনি) তখন স্বপ্ন দেখবো বলে গানটা গাইতাম প্রায়ই। আমাদের মেসে চাঁদপুর থেকে কিছু ছেলে এসেছিলো, ওরা চাঁদপুরের সব বন্ধুদের বলে দিয়েছিলো, আমি নাকি গানটা খুব ভালো গাই। তাদের মধ্যে কয়েকজন ঘুরতে এসেছিল ঢাকায়। এই গানটা সিডি প্লেয়ারে ছাড়তেই বন্ধ করে দিয়ে বলেছিলো, “তুমি গাও” ……… ওনার মত আকুলতা দিয়ে গাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিলোনা, হবেওনা। তবুও গানটা ভালোবাসতাম বলেই হয়তো কণ্ঠে সেটা টের পাওয়া যেতো।

ওনার বিশেষ ভালো লাগা গানগুলো

চিঠি গানটা আমাকে খুব বেশি মাত্রায় টানে। গানটার মধ্যে কেমন যেন একটা ডার্ক টোন আছে। একলা থাকার হতাশা আছে, আবার জীবন শেষ না হয়ে যাওয়ার গল্পও আছে। এই গানটিতে হাজার মাইল দূরে নিজের সংগীর কাছে নিজের খবরাখবর জানাতে গিয়ে তিনি যখন গেয়ে ওঠেন

বলতে ভুলেছি সেই যে গাছটা, আধমরা সেই ফুলের গাছটা
সেই গাছটাতে, নতুন কুঁড়িতে নতুন প্রাণের ছন্দ,
বাঁচার এ কী আনন্দ!

তখন নিজের প্রত্যেকটা কোষের অস্তিত্ব টের পাই। আমার ঘরের পাশে তোমার বাড়ি হবে গানে যখন নির্মাণরত বাড়ির ফ্রেমে আঙ্গুল বোলাতে দেখে গেয়ে ওঠে্ন, “তখন ভাবি আমি পলকা মানুষগুলো ক’দিন বাঁচে” – তখন বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কাছে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। এই গানটাতে হঠাৎ করে হাসন রাজার ‘লোকে বলে, বলে রে’ গানটার সুর ভেসে আসে, প্রথমবার শুনতে গিয়ে চমকে উঠেছিলাম,

যখন ভাবি আমি পাখির ওড়ার কথা দু ডানা মেলে
তখন আমার সেই হাসন রাজার গান, হাসন রাজার কথা মনে পড়ে
লোকে বলে, বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা না আমার
লোকে বলে, বলে রে…

তুমি আমার, আমি তোমার- টাইপের সস্তা গান মৌসুমী গাননি কখনো। তার গানের থিমের সবটা জুড়েই ছিলো জীবন দর্শন। চেনা পথের বাইরে গিয়ে পথ হাতড়াতে বলেছেন আমার কিছু কথা ছিলো গানে। মানুষের চিন্তার পার্থক্য নিয়ে গেয়েছেন আমি যা দেখি তুমি তা দেখো কি গানটি। এত জ্ঞান চোখের সামনে থাকার পরেও মানুষের সচেতনতার অভাব নিয়ে গেয়েছেন ভাগ্যলিখন গানে, শুনতে চেয়েছেন নতুন কথা

কেউ যদি আজ অন্য কথা বলতো তবে বেশ তো হতো।
নতুন কোন পাহাড় যদি চূড়োর দিকে টেনে নিতো!

শ্রমজীবী মানুষ আর শ্রেণীবৈষম্য নিয়ে গেয়েছেন একাধিক গান – ক্ষত, ফুটপাতের মেয়ে, হয়তো, এই আধপোড়া শহরটা, ইত্যাদি… এ গানগুলো থেকে তার চিন্তাভাবনার ঘরানা সম্পর্কে ভালো একটা ধারণা পাওয়া যায়। মৌসুমী যে একটি বিশেষ দলের শ্রোতাদের কাছে অন্যদের চেয়ে বেশি শ্রদ্ধেয়, সেটার কারণ এই গানগুলো। এ গানগুলো কেবল তার শৈল্পিক উপাদান তৈরির চাহিদা-ই পূরণ করেনি, তার দায়িত্বশীল স্বত্ত্বারও বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।

যে বীজ তিনি বুনে দিলেন আমার ভেতরে

গান যে এতো গভীর হতে পারে, গানের গভীরতা যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত করে রাখতে পারে, এটা প্রথমবার আবিষ্কার করি মৌসুমী ভৌমিকের গানের মধ্য দিয়েই। আমার পনেরো-ষোল বছর বয়সী কিশোর মনের মধ্যে অনেক কিছু নিয়ে চিন্তা করার উৎসাহ জাগিয়ে তুললেন তিনি। এতোদিন গান শুনতাম শুধু বিনোদনের জন্য, তখন থেকে গান চিন্তা-ভাবনার খোরাক হয়ে উঠলো। এরপর সুমন চট্টোপাধ্যায়, পিংক ফ্লয়েড, লোপামুদ্রা মিত্র, জন ডেনভার সহ আরো অনেকের গান শুনে এমন ডুবে গেছি, কিন্তু শুরুটা হয়েছিলো মৌসুমী ভৌমিকের হাত ধরেই।

গান সম্পর্কে আমার রুচি অনেক পাল্টে গেলো ওনাকে পেয়ে। সমাজ, দেশ, রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করাও শুরু করলাম তখন থেকেই; অবশ্য এক্ষেত্রে আমার বয়স, বই পড়া, বিতর্ক পরিষদে বিতর্ক শিখতে যাওয়া সহ আরো কিছু ব্যাপার প্রভাব রেখেছিলো, তবুও মৌসুমী ভৌমিকের প্রভাব কিছুটা তো ছিলোই। এখনো ওনার গানগুলো আমার কাছে পুরনো হলো না…… উনি একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন, ওনার সংগীত সন্ধ্যায় না যেতে পেরে আমার খুব কষ্ট হয়েছিলো। কখনো যদি সম্ভব হয়, তাহলে একবার হলেও কলকাতায় গিয়েই দেখা করে আসবো!

গান সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা ০২ – বন্ধু সৌরভ বড়ুয়ার সাথে গান গাওয়া

Share:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *